উহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

বদর যুদ্ধ হয়েছিল ২য় হিজরির রমাদান মাসে। তার ঠিক এক বছর পর ৩য় হিজরির শাওয়াল মসে কুরাইশের কাফিররা মদিনায় আবার যুদ্ধ করতে আসে। আবু সুফিয়ান যে ব্যবসায়িক কাফেলা নিয়ে নিরাপদে মক্কায় পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেই কাফেলার সব সম্পদ যুদ্ধের জন্য ব্যয় করা হয়েছিল। তার প্রিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে এক হাজার উট এবং পঞ্চাশ হাজার দিনার।

 

আবু সুফিয়ান মক্কাবাসীকে এই বলে বুঝিয়েছিল যে এই সম্পদ দিয়ে আগামী বছর আমরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। তার কথায় সবাই রাজি হয়। কেউই তার ব্যবসায়িক অংশ ফেরত নেয়নি।

 

তখন মক্কার কাফির নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিল সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া এবং ইকরামা বিন আবু জাহল। তারা দুজন পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আর মক্কার প্রধান ছিলেন আবু সুফিয়ান। তিনিও পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রথম দুজনের পিতা বদরে নিহত হওয়ায় তারা উন্মুখ হয়েছিলেন মুসলমানদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য।

 

কুরাইশের কাফিররা নিজেদের থেকে যোদ্ধা সংগ্রহের পাশাপাশি আশেপাশের কয়েকটি গোত্র থেকেও যোদ্ধাদের নিজ দলে নেয়। এতে তাদের বাহিনীর সংখ্যা হয়ে যায় তিন হাজার। এদের সবাই ছিল বর্মে সজ্জিত। এছাড়া ছিল তিন হাজার উট এবং দুইশ ঘোড়া। যোদ্ধা ছাড়াও সাথে পনেরজন সুন্দরী নারী নেয়া হয় বীরদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দও ছিলেন এই দলে। তিনিও পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

 

যোদ্ধাদের মনোবল বাড়ানোর জন্য তারা দুজন কবিকেও সাথে নিয়েছিল। আরবদের মনে কবিতার প্রভাব ছিল খুব বেশি। বিভিন্ন যুদ্ধে নিন্দা ও বীরত্বমূলক কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে তারা প্রতিহিংসার আগুন ছড়িয়ে দিত। এই দুজন কবির মধ্যে একজন ছিল আব্দুল ওযযা। বদরে সে বন্দী হওয়ার পর সে ওয়াদা করেছিল যে আর কোনোদিন মুসলমানদের বিরুদ্ধে কবিতা রচনা করবে না। কিন্তু কাফিরদের প্ররোচনায় সে তার ওয়াদা ভঙ্গ করে।

 

মক্কায় কাফির বাহিনীর প্রস্তুতির খবর খুব দ্রুতই পৌঁছে যায় মদিনায়। এই সংবাদ রাসুলুল্লাহ সা. এর চাচা আব্বাস রা. চিঠি লিখে একজন দূতের মাধ্যমে মদিনায় এই সংবাদ পাঠিয়ে দেন। তখনো তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। তবে তিনি আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনোকিছু করেননি।

 

দূত যখন এই সংবাদ রাসুলুল্লাহ সা. কে দেয় তখন তিনি কুবা মসজিদে ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সা. এই সংবাদ গোপন রেখেছিলেন যেন কাফিররা তাদের প্রস্তুতির সংবাদ জানতে না পারে। রাসুলুল্লাহ সা. তখন আনসারদের গোত্র প্রধান এবং বিশিষ্ট মুহাজির সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করলেন। মদিনায় যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল।

 

মুসলমানরা সবাই অস্ত্র বহন করতে শুরু করলেন। এমনকি নামাযের সময়ও তারা অস্ত্র সাথে রাখতেন। রাসুলুল্লাহ সা. এর নিরাপত্তার জন্য কয়েকজন সাহাবিকে দায়িত্ব দেয়া হলো। ছোট ছোট কিছু দলকে পাঠিয়ে দেয়া হলো মদিনার আশেপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণের জন্য।

 

হিন্দের ঘৃণ্য প্রস্তাব

আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ উহুদ যুদ্ধে কাফির বাহিনীর সাথে গিয়েছিল। তারা বাবা উতবা বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে সেও মরিয়া হয়ে ওঠছিল। মদিনার কাছাকাছি আবওয়া নামের এলাকায় যেখানে রাসুলুল্লাহ সা. এর মা আমিনাকে বহু আগে দাফন করা হয়েছিল সেখানে আসার পর সে কুরাইশ নেতাদের আহবান জানায় তা৬র কবর খুঁড়ে তার পবিত্র দেহাবশেষ ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলতে। তবে তার এই প্রস্তাবে কেউ রাজি হয়নি। কারণ প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ইন্তেকাল করা একজন  নারীর কবর খুঁড়ে এই কাজ করা হলে তার পরিণতি তাদের জন্য অনেক ভয়াবহ হত। তবে রাসুলুল্লাহ সা. ও মুসলমানদের প্রতি হিন্দের ঘৃণা এত বেশি ছিল যে তার মাথাইয় এমন দুঃসাহসী ও ঘৃণ্য পরিকল্পনা এসেছিল। এরপর উহুদ যুদ্ধে শহীদদের লাশ নিয়ে সে যা করেছিল তার বর্ণনা আমরা সামনে আনব।

 

উহুদ যুদ্ধের আগে রাসুলুল্লাহ সা. এর স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা

যখন মদিনায় উহুদ যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল, তখন আল্লাহর রাসুল সা. কিছু স্বপ্ন দেখলেন যার মধ্যে উহুদ যুদ্ধের ফলাফলের ইঙ্গিত ছিল।

যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনার জন্য যখন রাসুলুল্লাহ সা. আলোচনা করছিলেন, তখন তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে কিছু গাভী জবাই করা হচ্ছে। এর ব্যাখ্যা হলো, এই যুদ্ধে আমার কয়েকজন সাহাবি শহিদ হবেন। আরু দেখেছি যে আমি আমার হাত বর্মের ভেতর প্রবেশ করিয়েছি এবং তা নিরাপদ। আমার তরবারিতে পরাজয়ের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি।

 

রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, নিরাপদ বর্ম মানে হচ্ছে মদিনা শহর। আর পরাজইয়ের চিহ্ন মানে হলো আমার পরিবার থেকে কেউ শহীদ হবেন।

 

এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেয়ার পর রাসুলুল্লাহ সা. যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন। তিনি প্রথমে চেয়েছিলেন মদিনার ভেতর থেকে লড়াই হবে। সাহাবিরা রাস্তায় লড়াই করবেন এবং মহিলারা ছাদের ওপর থেকে আক্রমণ করবেন। কিন্তু সাহাবিদের মধ্যে যারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি তারা ইসলামের পক্ষ লড়াই করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তারা মদিনার বাইরে গিয়ে খোলা ময়দানে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করাকেই ভালো মনে করলেন। রাসুলুল্লাহ সা. তাদের প্রস্তাব গ্রহন করলেন এবং মুসলিম বাহিনী মদিনার বাইরে যাত্রা শুরু করল।

 

লেখক: নাজমুস সাকিব


প্রকাশের তারিখ : ৫ জানুয়ারি ২০২৫

শেয়ার করুন :

Currently Reading

উহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

Contact Us

,

Design & Developed by Neoscoder © 2026 - All right reserved by Ampublications

  • Privacy Policy
  • Terms & Conditions
  • Help & Support