উহুদ যুদ্ধের ফলাফল
উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় ঘটেছিল একথা বলা যায় না। বরং বলা যায়, এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী তিনবার বিজয় লাভ করেন।
প্রথমত, যুদ্ধের প্রথমদিকে অল্পতেই কাফিররা ধরাশায়ী হয়ে যায় এবং মুসলমানদের বীরত্বে ভয় পেয়ে পালাতে শুরু করে। এরপর কাফিররা অতর্কিত আক্রমণ করে। সেসময় মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। তারা তখন কাফিরদের ফেলে যাওয়া গণীমত সংগ্রহ করছিলেন।
অপ্রস্তুত অবস্থায় কাফিরদের হামলা হওয়ায় মুসলিম বাহিনীর প্রথমদিকে বেশ ক্ষতি হয়। কিন্তু সাহাবিরা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে আবারও মুশরিকদেরকে পরাজিত করেন। আবারও কাফির বাহিনী যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে চলে যায়।
এরপর আরও একবার মুসলমানরা বিজয় অর্জন করেছিলেন। সে ঘটনা আমরা পরে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
শহিদদের লাশ বিকৃতি
তবে উহুদের যুদ্ধে কাফিরদের অনেক বড় পরাজয় ঘটেছিল নৈতিক দিক থেকে। এমনিকে কাফিরদের তো নৈতিকতা বলতে কিছু ছিলই না। তার ওপর তারা শহীদদের লাশ বিকৃত করেছিল যার নজির আরবে অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
বদরের যুদ্ধে বড় বড় কাফির নেতারা নিহত হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সা. তাদের লাশ উন্মুক্ত প্রান্তরে ফেলে রাখেননি। তাদের লাশগুলো পরিত্যাক্ত কুয়ায় ফেলে দেয়া হয় যেন হিংস্র পশু বা পাখি সেগুলোকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে না পারে।
কিন্তু মক্কার মুশরিক নারীরা নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে মুসলিম শহীদদের লাশগুলোকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে।
উহুদ যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দের নেতৃত্বে কয়েকজন নারী অংশ নিয়েছিল বলে আমরা জেনেছি। উহুদ যুদ্ধের শেষদিকে তারা শহীদদের লাশগুলোকে বিকৃত করতে শুরু করে। তারা ছুরি দিয়ে সম্মানিত শহীদদের নাক-কান ও অন্যান্য অঙ্গ কেটে নেয় এবং সেগুলো দিয়ে মালা বানিয়ে পরিধান করে। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দের বাবা ও ভাইকে বদর যুদ্ধে হত্যা করা হয়েছিল। এই ক্ষোভে সে রাসুলুল্লাহ সা. এর প্রাণপ্রিয় চাচা হামযা রা. এর দেহকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে। সে বুক চিড়ে কলিজা বের করে চিবিয়ে গেলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা না পেরে চিবিয়ে ফেলে দেয়।
কতটুকু বিদ্বেষ আর পশুত্ব মনে থাকলে মানুষ এমন কাজ করতে পারে। জাহিলিয়াত আর কুফুরি মক্কার কুরাইশ নারীদের এতটাই হিংস্র করে তুলেছিল।
হিন্দের এই কাজের জন্য আবু সুফিয়ান কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এটি তার একটি বক্তব্যে বোঝা যায়। যুদ্ধের শেষদিকে কাফিররা যখন ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল তখন আবু সুফিয়ান রাসুলুল্লাহ সা., আবু বকর রা. এবং ওমর রা. এর নাম ধরে জিজ্ঞেস করে যে এরা জীবিত আছে কিনা। রাসুলুল্লাহ সা. ও আবু বকর রা. চুপ থাকলেও ওমর রা. বলেছিলেন, হে আল্লাহর শত্রু! এরা সবাই জীবিত আছেন।
তখন আবু সুফিয়ান এই বলে ঘোষণা দেয়, এটা ছিল বদরের প্রতিশোধ। সামনের বছর আবার তোমাদের সাথে মোকাবিলা হবে। এরপর সে কুরাইশ কাফিরদের দেবতা উযযার নামে ধ্বনি দেয়। তখন মুসলমানরাও আল্লাহর নামে তাকবির দেন।
এরপর আবু সুফিয়ান জানায়, তোমাদের কয়েকজনের লাশ বিকৃত করা হয়েছে। আমি তাদেরকে এটা করতে বলিনি। তবে আমি তাতে অসন্তুষ্টও নই। শহীদদের লাশ বিকৃতি করেছিল আবু সুফিয়ানেরই স্ত্রী হিন্দ। আবু সুফিয়ান মুখে বলেছিল যে সে এই কাজে অসন্তুষ্ট নয়। তবে মূলত নিজের দায়মুক্তির জন্য সে এই কথা বলেছিল।
এই যুদ্ধে কুরাইশের মূল লক্ষ্য ছিল রাসুলুল্লাহ সা. কে শেষ করে দেয়া। কিন্তু মহান আল্লাহ রাসুল সা. কে রক্ষা করেছেন। এই যুদ্ধে কাফিররা নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে না পারায় মনে ক্ষোভ নিয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হয়। এই যুদ্ধে মুসলমান বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় সাতশ। এদের মধ্যে ৭০ জন শাহাদাত বরণ করেন। আর কাফিরদের মধ্যে ২২ জন অথবা মতান্তরে ৩৭ জন নিহত হয়েছিল।
যুদ্ধের পর রাসুলুল্লাহ সা. আহত সাহাবিদের নিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন। যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা যখন তাদের স্বজনদের শাহাদাতের সংবাদ শুনছিলেন তখন তারা ইন্না-লিল্লাহ পড়ছিলেন। কিন্তু তাদের দুশ্চিন্তা ছিল রাসুলুল্লাহ সা. কে নিয়ে। তারা উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন, রাসুলুল্লাহ সা. কেমন আছেন? এমনই ছিল রাসুলুল্লাহ সা. এর প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা।
লেখক: নাজমুস সাকিব
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫
শেয়ার করুন :
Currently Reading
