মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন
আমরা আগেই জেনেছি, মদিনায় মুসলমানদের শত্রুদের মধ্যে নতুন একটি শ্রেণির উদ্ভব হয়। এদেরকে বলা হতো মুনাফিক। এরা মুখে মুখে নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করলেও তাদের মনে ভালোবাসা ছিল কাফিরদের জন্য।
মুনাফিক মানে যে লুকিয়ে রাখে। এই লোকগুলো মুখে ঈমান আনলেও তাদের মনে কুফুরি লুকিয়ে রেখেছিল। তাই তাদেরকে বলা হত মুনাফিক।
এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মুনাফিক ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। সে ছিল গত্রপতি এবং আল্লাহর রাসুল সা. এর অন্যতম শত্রু। মুখে মুখে সে নিজেকে খুব অনুগত একজন ঈমানদার বলে দাবি করত। কিন্তু সবসময় চেষ্টা করত ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্য।
উহুদ যুদ্ধে সে তার গোত্রের লোকদের নিয়ে চলে গিয়েছিল জিহাদ না করে। বনু মুসতালিকের অভিযানে সে অংশ নিয়েছিল।
বনু মুসতালিকের এলাকায় অবস্থানকালে দুজন সাহাবির দুই ক্রীতদাসের মধ্যে ঝগড়া হয়। এই দুজনের মধ্যে একজন ছিলেন মুহাজির এবং অন্যজন আনসার। দুজনের মধ্যে বাক-বিতণ্ডার এক পর্যায়ে একজন মুহাজিরদের ডাক দেয় এবং অন্যজন আনসারদের ডাক দেয়। অর্থাৎ তারা নিজেদের বিরোধকে আনসার-মুহাজিরদের বিরোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।
মুহাজিরদের জন্য মদিনার আনসাররা কত ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন আমরা জেনেছি। যারা মুহাজির তারা মদিনার বাইরের মানুষ ছিলেন। অন্য স্থান থেকে আগতদের জন্য কেউ এভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছে বলে ইতিহাসে কোনো প্রমাণ নেই। আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল তা হয়েছিল ইসলামের বদৌলতে। কারণ জাহিলি আরবে শত্রুতা ঐ হানহানির যে নজির আমরা দেখতে পাই, সেখানে এমন ভালোবাসা তৈরি হওয়াটা ছিল অকল্পনীয়।
সাহাবিদের ইসলাম গ্রহণের পর তখন পর্যন্ত খুব বেশিদিন পার হয়নি। দুজন ক্রীতদাসের ডাকে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে দ্বন্দ সৃষ্টি হয়ার আশংকা ছিল।
রাসুলুল্লাহ সা. তখন তাদেরকে বললেন, ইসলামে আসার পর পরও তোমরা জাহিলি যুগের মত অকল্যাণের আহবান করছ?
সাহাবিরা তখন সাথে সাথে সতর্ক হয়ে যান। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই একে সুযোগ মনে করে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে দ্বন্দ সৃষ্টির চেষ্টা করে। সে বলতে থাকে, মুহাজিরদেরকে তোমরা তোমাদের দেশে জায়গা দিয়েছ। তাদেরকে নিজের সম্পদে ভাগ দিয়েছ। তোমরা নিজেদের সম্পদ রক্ষা করলে তারা অন্য কোথাও আশ্রয় নিত।
এই খবর যায়দ ইবনে আরকাম রা. রাসুলুল্লাহ সা. কে জানিয়ে দেন। ওমর রা. তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে হত্যা করার অনুমতি চাইলে রাসুলুল্লাহ সা. তাকে নিষেধ করেন এবং বলেন, যদি আমি তাকে হত্যা করার অনুমতি দেই তখন মানুষ বলবে, মুহাম্মদ নিজের সঙ্গীদেরকেও হত্যা করেছে।
এর বদলে রাসুলুল্লাহ সা. তখুনি মদিনায় রওয়ানা হন। সাধারণত রাসুলুল্লাহ সা. ভোরে যাত্রা ক্রতেন। সেদিন অসময়ে যাত্রা করেন এবং সারারাত ধরে পথ চলেন। এরপর সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যান।
সবাই পথ চলতে ব্যস্ত থাকায় সেসময় কেউ আর দ্বন্দে জড়ানোর সুযোগ পায়নি। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যখন জানতে পারে যে রাসুলুল্লাহ সা. তার মন্তব্য জেনে গেছেন, তখন সে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করে। রাসুলুল্লাহ সা. তাকে কিছুই বলেননি।
সেসময় মহান আল্লাহ মুনাফিকদের সম্পর্কে সুরা মুনাফিকুন অবতীর্ণ করেন। এই সুরায় মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মন্তব্য উল্লেখ করে বলেন,
তারা বলে, যদি আমরা মদিনায় ফিরে যাই তখন আমাদের মধ্য থেকে যারা বেশি সম্মানিত তারা অধিক দুস্থদেরকে সেখান থেকে বের করে দিবে। আর আল্লাহরই জন্য মর্যাদা এবং তাঁর রাসুলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। কিন্তু মুনাফিকরা উপলব্ধি করে না। [সুরা মুনাফিকুন : ৮]
অবাক করার মত বিষয় হলো, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইর ছেলে আব্দুল্লাহ ছিলেন একজন খাঁটি মুমিন। তিনি রাসুলুল্লাহ সা. কে এসে বলেছিলেন, আপনি বললে আমিই আমার বাবাকে হত্যা করব। কারণ অন্য কেউ তাকে হত্যা করলে পিতার হত্যাকারী হিসেবে আমি তাকে হত্যা করব। তখন একজন মুমিনকে হত্যা করার অপরাধে আমাকে জাহান্নামে যেতে হবে। তার চেয়ে আমিই তাকে হত্যা করা নিরাপদ মনে করি।
রাসুলুল্লাহ সা. তাকে এই অনুমতি দেননি। শুধু তাই নয়, তিনি মদিনায় তার পিতাকে ঢুকতে বাধা দিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সা. অনুমতি দিলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মদিনায় প্রবেশ করে।
তবে এরপর থেকে আর তার প্রভাব আগের মত বজায় থাকেনি। কাওরণ তখন অন্যরা তার মনোভাব বুঝে ফেলেছিল যে সে মুমিনদের মধ্যে দ্বন্দ সৃষ্টি করতে চায়। আল্লাহর দেয়া ঘোষণা অনুযায়ী সে মুনাফিক। এরপর থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে কোনো সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা করলে অন্যরাই তাকে বাধা দিয়েছে।
এই অবস্থা দেখে রাসুলুল্লাহ সা. ওমর রা. কে বলেছিলেন, দেখলে ওমর? সেদিন তাকে হত্যা করলে সেটা কেমন হত? আজ সে নিজের লোকদের কাছেই অপমানিত হচ্ছে।
লেখক: নাজমুস সাকিব
প্রকাশের তারিখ : ৯ মার্চ ২০২৫
শেয়ার করুন :
Currently Reading
