মক্কাবিজয় পরবর্তী কিছু ঘটনা

আনসারদের মনে ভয়

রাসুলুল্লাহ সা. মক্কা বিজয়ের পর বেশ কিছুদিন মক্কায় অবস্থান করেন। কেউ বলেছেন ১০ দিন বা তার চেয়ে বেশি। কেউ বলেছেন ১৪ দিন বা ১৯ দিন। এই সময় রাসুল সা. ও মদিনা থেকে আসা সাহাবিরা নামায কসর করেছেন। এর মাধ্যমে বুঝা যায়, রাসুল সা. বেশিদিন মক্কায় অবস্থান করতে চাননি।

 

মক্কা বিজয় হওয়ার পর মদিনার আনসার সাহাবিরা ভেবেছিলেন, এবার হয়ত রাসুল সা. মক্কায় থেকে যাবেন। প্রথমত মক্কা তার জন্মভূমি। এখানকার অধিবাসীরা একসময় তাঁকে বের করে দিলেও এখন তিনি মক্কা জয় করেছেন। সর্বোপরি এখানে আল্লাহর ঘর কাবা ও মসজিদে হারাম অবস্থিত। আল্লাহর ঘর ছেড়ে কি আর তিনি মদিনায় থাকবেন?

 

এসব ভেবে আনসারি সাহাবিদের মধ্যে হতাশা কাজ করছিল। মহান আল্লাহ অহির মাধ্যমে রাসুল সা.-কে এই বিষয়টি জানিয়ে দেন। রাসুল সা. তখন মদিনার আনসারদের জানিয়ে দেন যে তিনি আবার মদিনায় ফিরে যাবেন। রাসুল সা. তাদেরকে বললেন, আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আমি তোমাদের কাছে হিজরত করেছি। বাঁচা-মরা সবই তোমাদের সাথে।

 

 

বনু জুযাইমায় অভিযান

মক্কায় থাকাবস্থায় রাসুল সা. জুযাইমা গোত্রে একটি বাহিনী পাঠান। তারা ছিল মক্কার কাছাকাছি একটি গোত্র। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.। তিনি তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করেন। কিন্তু তারা অস্বীকৃতি জানায়। তখন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. তাদেরকে হত্যা করেন ও অনেককে বন্দী করেন।

 

তার সহযোদ্ধা সাহাবিরা তার কর্মকাণ্ডে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু খালিদ রা. তাদের কথা শোনেননি। পরদিন তিনি বন্দিদেরকেও হত্যা করার আদেশ দেন। কোনো কোনো সাহাবি এই আদেশ পালন করেননি। তারা বুঝতে পারছিলেন, এভাবে গণহারে হত্যা করা রাসুল সা.-এর আদর্শ নয়।

 

খালিদ রা.-এর এই কঠোর মনোভাবের পেছনে অবশ্য কারণ ছিল। জাহিলি যুগে এই গোত্রের সাথে তার শত্রুতা ছিল। খালিদ রা.-এর এক চাচাকে এই গোত্র হত্যা করেছিল। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. অবশ্য তাকে বলেছিলেন, তুমি তোমার চাচার কারণে এদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছ।

 

রাসুল সা. যখন এই ঘটনা জানতে পেরেছিলেন, তখন তিনি আসমানের দিকে হাত তুলে বললেন, হে আল্লাহ, খালিদ যা করেছে তা থেকে আমি নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করছি এবং পরবর্তীতে এ ঘটনার জন্য তাকে ভর্ৎসনা করেন। তবে তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-কে ওই বাহিনীর নেতৃত্ব থেকে বরখাস্ত করেননি।

 

রাসুল সা.-এর আদর্শ এমনই ছিল। তিনি কেউ ভুল করলে তাকে এমন শাস্তি দিতেন না যাতে বিশৃঙ্খলা হতে পারে। আর তাদেরকে হত্যা করা ছিল খালিদ রা.-এর ইজতেহাদ। সেনাপতি হিসেবে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার ছিল। তিনি তার নিজস্ব চিন্তা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাসুল সা. তাতে সমর্থন দেননি।

 

এরপর অবশ্য রাসুল সা. ওই গোত্রের নিহত লোকদের ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলেন। আলি রা.-কে তিনি অনেক ধন সম্পদ দিয়ে পাঠান এবং তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। ক্ষতিপূরণ দেয়ার পর আলি রা.-এর কাছে কিছু সম্পদ ছিল। তিনি সেগুলোও আল্লাহর রাসুল সা.-এর পক্ষ থেকে তাদের দিয়ে দেন। রাসুল সা. তার এই কাজে খুশি হয়েছিলেন।

 

 

জাহিলি যুগের মূর্তি ধ্বংস

আমরা আগে জেনেছি, রাসুল সা. কাবার চারপাশ ঘিরে থাকা মূর্তিগুলোকে ভেঙে ফেলেছিলেন। কিন্তু মক্কার বাইরে বেশ বড় কিছু মূর্তি ছিল। কুরাইশের উজ্জা দেবতার মূর্তি ছিল একটি খেজুর বাগানে অবস্থিত। রাসুল সা. খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর নেতৃত্বে ৩০ জনের একটি বাহিনী পাঠান। তারা কবিতা আবৃত্তি করতে করতে এই মূর্তি ভেঙে দেন।

 

আমর ইবনে আস রা.-কে রাসুল সা. হুযাইল গোত্রের সবচেয়ে বড় মূর্তি সুয়া’ ধ্বংস করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। এই মূর্তিটি ছিল অনেক প্রাচীন। নুহ আলাইহিস সালামের কওম এটির পূজা শুরু করেছিল। মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে ছিল এর অবস্থান। এটিও ভেঙে ফেলা হয়।

 

আরেক দেবতা মানাতের মূর্তি ছিল সমূদ্রের তীরবর্তী স্থানে। সেখানে সাদ ইবনে যায়দ আল আশহালি রা.-এর নেতৃত্বে বিশজনের একটি বাহিনী পাঠান রাসুল সা.। এই মূর্তিটি ভাঙ্গার মাধ্যমে জাহিলি যুগের সব মূর্তি ও শিরকের প্রতীক ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়।

 

লেখক: নাজমুস সাকিব


প্রকাশের তারিখ : ২ নভেম্বর ২০২৫

শেয়ার করুন :

Currently Reading

মক্কাবিজয় পরবর্তী কিছু ঘটনা

Contact Us

,

Design & Developed by Neoscoder © 2026 - All right reserved by Ampublications

  • Privacy Policy
  • Terms & Conditions
  • Help & Support