মদিনায় ইহুদিদের সাথে রাসুলুল্লাহ সা. এর সাক্ষাত
আমরা আগেই জেনেছি, মদিনায় আরবদের সাথে ইহুদিদেরও বসবাস ছিল। অনেক আগ থেকে নানা স্থান থেকে ইহুদিরা এসে এখানে বসতি গেড়েছিল। কারণ তারা জানতে পেরেছিল, শেষ নবি এখানে আসবেন এবং মদিনাই হবে তাঁর আবাস।
তাছাড়া যখন রাসুলুল্লাহ সা. মক্কায় ছিলেন তখন মক্কার কাফিররা ইহুদিদের কাছে জানতে এসেছিল শেষনবি সম্পর্কে। ইহুদিরা মক্কার কাফিরদেরকে তিনটি প্রশ্ন শিখিয়ে দিয়েছিল। তারা বলেছিল, যদি তিনি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারেন তাহলে বুঝতে হবে তিনি সত্যিই নবি। আর যদি না পারেন তাহলে তিনি আসলে নবি নন।
তবে রাসুলুল্লাহ সা. সবগুলো প্রশ্নের উত্তর ঠিকমত দিতে পেরেছিলেন। তবু তারা ঈমান আনেনি।
মদিনায় রাসুলুল্লাহ সা. এর আগমনের পর এটাই যৌক্তিক ছিল যে ইহুদিরা সবাই এসে আগে ইসলাম গ্রহণ করবে। কারণ তারা শেষনবি সম্পর্কে আগ থেকে জানত এবং তাদের কাছে পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবসমূহের জ্ঞান ছিল। কিন্তু তারা নিজেদের বাপ-দাদার ধর্ম থেকে বের হতে পারেনি। রাসুলুল্লাহ সা. আরবদের মধ্য থেকে হওয়ায় তারা তাঁকে নবি হিসেবে মেনে নিতে পারেননি।
আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রা. এর ইসলাম গ্রহণ
আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রা. ইহুদিদের বনু কায়নুকা গোত্রের একজন। তিনি ছিলেন সেসময় মদিনার ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পণ্ডিত। ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল সবার চেয়ে বেশি। মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন সবার কাছে গ্রহ্ণযোগ্য ও সম্মানের পাত্র।
মদিনায় রাসুলুল্লাহ সা. আসার পর ইহুদিরা তাঁকে দেখতে এসেছিল। তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রা.ও ছিলেন। তিনি এসে রাসুলুল্লাহ সা. কে তিনটি প্রশ্ন করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নবি ছাড়া কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, জান্নাতে মানুষের প্রথম খাদ্য কী হবে? কেয়ামতের প্রথম আলামত কী? সর্বশেষ প্রশ্ন ছিল, সন্তান কেন কখনো বাবার মত আবার কখনো মায়ের মত হয়?
রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর প্রশ্ন শুনে বললেন, এই মাত্র জিবরাইল আ. আমাকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানিয়ে গেলেন। একথা শুনে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম বললেন, জিবরাইল তো আমাদের শত্রু। যেহেতু তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি তাই তার বিশ্বাস অনুযায়ী একথা বলেছিলেন।
রাসুলুল্লাহ সা. তার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছিলেন সুন্দর করে। জান্নাতে মানুষকে প্রথম খাওয়ানো হবে মাছের কলিজা। কেয়ামতের প্রথম আলামত হবে আগুন। পূর্ব দিক থেকে এই আগুন শুরু হয়ে মানুষকে পশ্চিম দিকে নিয়ে যাবে। আর সন্তান বাবার মত হয় যদি পুরুষের বীরয স্ত্রীর বীর্যের চেয়ে এগিয়ে থাকে। আর যদি স্ত্রীর বীর্য এগিয়ে থাকে তাহলে সন্তান মায়ের মত হয়।
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর শুনে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করেনব। তিনি বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি আল্লাহর রাসুল। আপনি যা নিয়ে এসেছেন তা সত্য। একথা বলে তিনি ইসলাম গ্রহন করেন।
তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সা.! ইহুদিরা অপবাদপ্রবণ জাতি। আপনি তাদেরকে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা না জানিয়ে তাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন।
রাসুলুল্লাহ সা. ইহুদিদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম কেমন ব্যক্তি? তারা সবাই বলল, সে আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং সর্বোত্তম ব্যক্তির সন্তান। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, সে কি ইসলাম গ্রহণ করতে পারে? ইহুদিরা বলে ওঠলো, না না। কখনোই না। আল্লাহ তাকে এমন কাজ থেকে রক্ষা করুন।
তখন আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রা. সবার সামনে এসে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা জানিয়ে দিলেন। সবাই তখন হায় হায় করল। তারা তখন বলল, এ তো আমাদের মধ্যে নিকৃষ্ট ব্যক্তি এবং নিকৃষ্ট ব্যক্তির সন্তান।
মদিনায় ইহুদিদের ধর্ম পণ্ডিত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রা. এর ইসলাম গ্রহণ ছিল অনেক বড় একটি ঘটনা। এর মাধ্যমে ইহুদিদের প্রতারক চরিত্র আল্লাহ প্রকাশ করে দেন। এরপর অবতীর্ণ বহু আয়াতে আল্লাহ তাদের বিষয়ে বলেছেন। সুরা বাকারার ১৪৬ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তারা তাঁকে (নবীকে চেনে যেভাবে তারা নিজের সন্তানদেরকে চিনে। আর তাদের মধ্য থেকে একটি দল অবশ্যই জেনেশুনে সত্যকে গোপন করে।
মক্কায় রাসুলুল্লাহ সা. এর শত্রু ছিল আরব মুশরিকরা। মদিনায় আরব মুশরিকদের সংখ্যা কম থাকলেও ইহুদিরা নতুন শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে তারা প্রকাশ্য শত্রুতা না করে গোপনে ষড়যন্ত্র করত। মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ সা. ইহুদিদের সাথে শান্তি বজায় রাখতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা তা বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ।
লেখক: নাজমুস সাকিব
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৪
শেয়ার করুন :
Currently Reading
