খন্দক যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা. এর কৌশল

পরিখা খনন করার পর রাসুলুল্লাহ সা. প্রায় তিন হাজার জনের বাহিনী নিয়ে মদিনা থেকে বের হয়ে পরিখার পাশে অবস্থান গ্রহণ করেন। এদিকে কাফিরদের সম্মিলিত বাহিনী এসে দেখতে পায়, তাদের সামনে গভীর পরিখা। তারা এটা দেখে হতবাক হয়ে যায়। কারণ আরবদের যুদ্ধের ইতিহাসে এমন পরিখা খনন করার কথা কেউ কখনো শোনেনি।

 

তারা ওপার থেকে কয়েকদিন যাবত তীর ছুঁড়ে মুসলমানদেরকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে। সে সময় ছিল শীতকাল। তারা তাই দীর্ঘ সময় অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়।

 

ইহুদিদের ষড়যন্ত্র

মদিনা থেকে বনু কাইনুকা ও বনু নাযিরকে তো আগেই বের করে দেয়া হয়েছিল। বনু কুরায়যা তখনো মুসলমানদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু তাদের নেতা হুয়াই যখন দেখল যে মদিনা থেকে নির্বাসিত ইহুদিরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য এসেছে তখন তাদর মধ্যেও মুসলমানদের শত্রুতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কাব ইবনে আসাদের কাছে গিয়ে তাকে প্ররোচনা দিতে শুরু করল যেন সে রাসুলুল্লাহ সা. এর সাথে কৃত চুক্তি বাতিল করে দেয়।

 

কাব প্রথমে তাকে তিরষ্কার করলেও পরে সে রাজি হয়ে যায় চুক্তি ভঙের জন্য। সে চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলে। তবে তাদের মধ্যে তিনটি শাখা গোত্র চুক্তি রক্ষা করবে বলে জানায় এবং তারা রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে গিয়ে নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করে।

রাসুলুল্লাহ সা. যখন চুক্তি ভঙের সংবাদ পান তখন কয়েকজন সাহাবিকে পাঠান সত্যতা যাচাইয়ের জন্য।

 

সেসময়টি ছিল মুসলমানদের জন্য অনেক কঠিন একটি সময়। কারণ তখন পরিখার উরপাশে দশ হাজারের বাহিনী। আর এদিকে মদিনার ভেতর আরেক শত্রু ইহুদিরা।

 

সাহাবিরা ইহুদিদের চুক্তি ভঙের সত্যতা যাচাই করে রাসুলুল্লাহ সা. কে জানান। তখন রাসুলুল্লাহ সা. কিছু সময় চাদর মুড়িয়ে শুয়ে ছিলেন। এরপর তিনি ওঠে বসেন এবং বলেন, হে মুসলমানরা! তোমরা বিজয় ও সাহায্যের সুসংবাদ গ্রহণ করো।

 

সেসময়টি ছিল খুবই কঠিন এক সময়। যারা ঈমানদার ছিলেন তাদের ঈমান তখন আরও বৃদ্ধি পায়। কারণ তারা জানতেন যে আল্লাহ অবশ্যই কোনো উপায়ে তাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তাদেরই বিজয় হবে। কিন্তু যারা ছিল মুনাফিক ও দুর্বুল ঈমানের অধিকারী, তারা বিদ্রুপ করতে লাগল। তারা বলল, সেদিন তো মুহাম্মদ আমাদেরকে শাম ও পারস্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। অথচ আজ প্রাকৃতিক প্রয়োজনও নির্বিঘ্নে পূরণ করা যাচ্ছে না। তারা অনেকেই তখন মদিনায় ফিরে যায়।

 

সেসময় রাসুলুল্লাহ সা. প্রায় পাঁচশজনের একতি বাহিনী মদিনায় থাকা নারী ও শিশুদের রক্ষার্থে পাঠান। এভাবে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা কমে যায়।

 

এদিকে ইহুদিদের চুক্তি ভঙ্গের কথা শুনে এবং মুনাফিকদের চলে যেতে দেখে মুশরিকদের সাহস বেড়ে যায়। তারা পরিখা পার হওয়ার পথ খুঁজতে থাকে। তারা কয়েকজন সাহস করে পরিখায় নেমে যায় সেটি পার হওয়ার জন্য। তখন আলি রা. মুসলমানদের একটি দল নিয়ে তাদেরকে প্রতিহত করে।

 

এভাবে মুশরিকদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন পরিখা পার হওয়ার চেষ্টা করে এবং আলি রা. তাদের সবাইকে হত্যা করেন।

 

রাসুলুল্লাহ সা. এর কৌশল

কাফিরদের ছত্রভঙ করতে এই যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা. কিছু কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তিনি ছোট গত্রগুলোর কাছে প্রস্তাব রাখতে চেয়েছিলেন যে প্রতিবছর  মদিনায় উৎপাদিত খেজুরের কিছু অংশ তাদেরকে দেয়া হবে। এর বিনিময়ে তারা যেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে যায়।

 

তিনি এই বিষয়টি আনসারি সাহাবিদের কাছে পেশ করেন। সাদ ইবনে মুআয ও সাদ ইবনে উবাদা রা. তখন রাসুলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞেস করেন, এটি কি আল্লাহর দেয়া বিধান নাকি আপনি আমাদের মাধ্যমে তা করতে চাইছেন? রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, আমি করতে চাইছি। কারণ শত্রুরা এখন এক যোগ হয়ে আমাদের ওপর হামলা করেছে। তখন তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সা.! যখন আমরা এবং এই গোত্রগুলো ঙ্কুফর অ শিরকের মধ্যে ছিলাম তখনও তারা আমাদের ফল-ফসল কিনে খেয়েছে। আর এখন আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। এখন আমরা তাদেরকে আমাদের সম্পদ এমনি দিয়ে দিব? আল্লাহর কসম! আমরা তাদেরকে তরবারির আঘাত ছাড়া আর কিছু দিব না যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে এবং তাদের মধ্যে ফায়সালা করেন।

একথা শুনে রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, ঠিক আছে। তোমাদের কথাই থাক।

 

এরপর গাতফান গোত্রের একজন ইসলাম গ্রহণ করে রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে আসেন এবং জানান, হে আলাহর রাসুল সা.! ইসলাম গ্রহণ করেছি। কিন্তু আমার সম্প্রদায় জানে না। রাসুলুল্লাহ সা. তাকে বললেন, তুমি একা আর কী করবে? পারলে তোমার গোত্রকে সম্মিলিত বাহিনি থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও।

 

সেই সাহাবির নাম ছিল নুয়াইম রা.। তিনি বেশ দক্ষতার সাথে সবাইকে যুদ্ধ থেকে ফেরাতে পেরেছিলেন। তিনি প্রথমে বনু কোরায়যাকে বুঝিয়ে তাদেরকে যুদ্ধ করা থেকে বিরত রাখেন। এরপর কুরাইশকে বলেন যে বনু কোরায়যা চুক্তিতে ফিরে এসেছে। এরপর নিজ গোত্রকে সতর্ক করেন।

 

এভাবে সেদিন যুদ্ধের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যায়।

 

লেখক: নাজমুস সাকিব


প্রকাশের তারিখ : ৬ এপ্রিল ২০২৫

শেয়ার করুন :

Currently Reading

খন্দক যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা. এর কৌশল

Contact Us

,

Design & Developed by Neoscoder © 2026 - All right reserved by Ampublications

  • Privacy Policy
  • Terms & Conditions
  • Help & Support