খন্দকের যুদ্ধ
৫ম হিজরির শাওয়াল মাসে রাসুলুল্লাহ সা. বড় একটি যুদ্ধাভিযান করেন। এর নাম খন্দকের যুদ্ধ বা আহযাবের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে একটি বিরাট পরিখা খনন করে শত্রু বাহিনীকে রুখে দেয়া হয়েছিল। তাই একে খন্দকের যুদ্ধ বলা হয়। আবার কুরাইশের কাফিররা ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি দল এতে অংশ নিয়েছিল। তাই একে আহযাবের যুদ্ধ বলা হয়। পবিত্র কুরআনে আহযাব নামে একটি সুরা অবতীর্ণ হয়েছে এই যুদ্ধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট
এই যুদ্ধে আরবের কুরাইশ, বেদুইন ও ইহুদিরা এক যোগে হামলা করেছিল। বনু নাযিরের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা. ইহুদিদেরকে মদিনা থেকে বের করে দিয়েছিলেন বলে আমরা জেনেছি। তাদের মধ্য থেকে একটি প্রতিনিধি দল প্রথমে মক্কায় গিয়ে কুরাইশের নেতাদেরকে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এমনিতে এর আগে দ্বিতীয় বদরের যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধ না করে মদিনা থেকে ফিরে এসেছিল। এজন্য তাদের মনে খভের আগুন জ্বলছিল মুসলমানদের বিরুদ্ধে। তারা খুব সহজেই রাজি হয়ে গেল এবং চার হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হলো।
ইহুদিরা এরপর আরবের ছোট কিছু গোত্র যেমন বনু আসাদ, বনু গাতফান, বনু মুররা, বনু সুলাইম এবং বনু আশজাকেও যুদ্ধের প্ররোচনা দেয় এবং জানায় যে এবার কুরাইশ তাদের সাথে আছে। তারা যুদ্ধের যাবার প্রস্তুতি নেয় এবং সব মিলিয়ে প্রায় দশ হাজার জনের বাহিনী মদিনার পথে এগুতে থাকে।
মুসলমানদের প্রস্তুতি
এদিকে রাসুলুল্লাহ সা. তাদের আগমনের খবর পেয়ে সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন। এত বড় বাহিনীকে মোকাবিলা করা সহজ বিষয় ছিল না। পরামর্শের বরকতে মহান আল্লাহ তাদের সামনে একটি অভিনব পন্থা খুলে দিলেন।
সাহাবিদের মধ্যে সালমান ফারসি রা. ছিলেন পারস্যের। তিনি বললেন, তাদের দেশে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য পরিখা খনন করা হয়। তার এই পরামর্শ রাসুলুল্লাহ সা. গ্রহণ করলেন। সাহাবিরা সবাই মিলে মদিনার সামনে পরিখা খনন করতে শুরু করলেন।
প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার লম্বা, গড়ে তিন মিটারের বেশি গভীর এবং প্রায় দেড় মিটারের বেশি চওড়া পরিখা খনন করতে গিয়ে সাহাবিদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল। রাত দিন পরিশ্রম শত্রু বাহিনী মদিনায় এসে পৌঁছার আগে তারা এই পরিখা খনন শেষ করেন।
এ সময় বেশি কষ্ট হয়েছিল ক্ষুধায়। সাহাবিরা পেটে পাথর বেঁধে কাজ করেছেন। তারা রাসুলুল্লাহ সা. এই বিষয়টি জানালে তিনি নিজের চাদর সরিয়ে দেখালেন যে তিনি দুটি পাথর বেঁধেছেন। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা. ত্যাগ দেখে সাহাবিরা কাজে আরও উদ্বুদ্ধ হন এবং তারা কবিতা আবৃত্তি করতে করতে মাটি খনন করতে থাকেন। এসময় তারা আবৃত্তি করছিলেন,
হে আল্লাহ! যদি আপনি হেদায়েত না দিতেন তাহলে আমরা সাদকা দিতাম না সালাতও আদায় করতাম না।
আপনি আমাদের ওপর প্রশান্তি অবতীর্ণ করুন এবং শত্রুর সামনে আমাদেরকে অবিচল রাখুন।
শত্রুরা আমাদের বিরুদ্ধে উস্কানি দিয়েছে। তারা আমাদের বিপদে ফেলতে চাইলেও আমরা মাথা নোয়াব না।
রাসুলুল্লাহ সা. এর মুজিযা
এই যুদ্ধে কয়েকটি ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সা. এর মুজিযা প্রকাশ পেয়েছিল। খন্দকের যুদ্ধে সবাই কাজে ব্যস্ত ছিলেন। খাবার সংগ্রহের সুযোগ ছিল না। সবাই ক্ষুধায় কাতর ছিলেন।
জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. তার স্ত্রীকে দিয়ে একটি বকরি জবাই করে তার মাংস রান্না করতে বলেন এবং এক সা পরিমাণ আটা দিয়ে রুটি তৈরি করে সেগুলো রাসুলুল্লাহ সা. এর জন্য নিয়ে আসেন। প্রিয় সাহাবিদেরকে ক্ষুধার্ত রেখে রাসুলুল্লাহ সা. তো আর খেতে পারেন না। তিনি সবাইকে ডেকে আনতে বললেন, এরপর সেই হাঁড়ি চুলায় দিলেন এবং সবাইকে সেখান থেকে গোশত পরিবেশন করতে লাগলেন।
সেদিন প্রায় এক হাজার সাহাবি তৃপ্তিমত খেয়ে ওঠলেন এবং যে পরিমাণ রুটি ও গোশত আনা হয়েছিল সে পরিমাণই রয়ে গেল।
তেমনি আরেকজন সাহাবির বোন কিছু খেজুর নিয়ে এসেছিলেন । সেগুলো রাসুলুল্লাহ সা. সবাইকে ডেকে খাওয়ান এবং সবার খাওয়া শেষে একই পরিমাণ খেজুর থেকে যায়।
আরেকটি মুজিযা প্রকাশ পেয়েছিল পরিখা খননের সময়। সাহাবিরা মাটি খুঁড়ে বিরাট একটি পাথরখণ্ড দেখতে পান যেটি ভাঙা যাচ্ছিল না। রাসুলুল্লাহ সা. নিজ হাতে বিসমিল্লাহ বলে সেটিকে আঘাত করেন। প্রথম আঘাতে সেটি একটু ভেঙে যায় এবং সেখান থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয়। আলোর ঝলক এত বেশি ছিল যে পুরো মদিনা আলোকিত হয়ে যায়। তখন রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, আল্লাহু আকবার। আমাকে শামের চাবি দেয়া হয়েছে। আমি এর লাল মহলগুলো দেখতে পাচ্ছি।
এরপর তিনি আরেকবার আঘাত করলেন। তখনও আল বের হলো এবং রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, আল্লাহু আকবার। আমাকে পারস্য দেয়া হয়েছে এবং আমি এর সাদা শহর দেখতে পাচ্ছি।
এরপর তৃতীয় আঘাত কলেন এবং তখনও আলো বিচ্ছুরিত হলো। তখনও তিনি বললেন, আল্লাহু আকবার। আমাকে ইয়েমেনের চাবি দেয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম। আমি এখান থেকে সানার ফটক দেখতে পাচ্ছি।
এরপর পাথরটি সাহাবারা সহজে সরিয়ে ফেললেন।
সেদিন মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহ সা. কে অদূর ভবিষ্যতে এসব শহর বিজয়ের সুসংবাদ দেন যা খুব দ্রুত সত্যে পরিণত হয়েছিল।
লেখক: নাজমুস সাকিব
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মার্চ ২০২৫
শেয়ার করুন :
Currently Reading
