হজের মৌসুমে অন্যান্য গোত্রে ইসলামের দাওয়াত

এতদিন পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ সা. শুধুমাত্র মক্কার কুরাইশ গোত্রের বিভিন্ন শাখা গোত্রের লোকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। মাঝে শুধু একবার গিয়েছিলেন তায়েফে। সেখানে সাকিফ গোত্র তাঁর সাথে অনেক দুর্ব্যবহার করে। মক্কায় ফিরে এসে তিনি আবার ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। তবে এবার তাঁর দাওয়াত আরও প্রসারিত হয়। যেহেতু মক্কায় আরবের নানা স্থান থেকে মানুষ হজ করতে আসত তাই মক্কা ছিল বহু গোত্রের মানুষের সম্মিলন কেন্দ্র। মক্কী জীবনের শেষদিকে রাসুলুল্লাহ সা. হজের মৌসুমে আসা আরবদের দাওয়াত দিতে শুরু করেন।

 

একদিন রাসুলুল্লাহ সা. চাচা আব্বাস রা.-কে বললেন, চাচা! আমি হজ করতে আসা মানুষের কাছে যেতে চাই। আমি আপনার ও আপনার ভাইয়ের কাছে এই বিষয়ে কোনো আপত্তি দেখি না। এখানে রাসুলুল্লাহ সা. ‘আপনার ভাই’ বলতে আবু লাহাবকে বুঝিয়েছেন। কারণ রাসুলের চাচাদের মধ্য থেকে আবু তালিব ইন্তেকাল করেছিলেন নবম হিজরিতে। হামযা রা. ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন আগেই। আব্বাস রা. তখনও ইসলাম গ্রহণ না করলেও ইসলামের বিরোধী ছিলেন না। তবে ব্যতিক্রম আবু লাহাব। ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি বিদ্বেষের কারণে মহান আল্লাহ তাকে ও তার স্ত্রীকে অভিশাপ দিয়ে কুরআনে একটি সুরা অবতীর্ণ করেছিলেন।

 

এভাবে রাসুলুল্লাহ সা. আরবের অন্য গোত্রদের কাছে ইসলাম প্রচারের আগে চাচাকে জানিয়ে নেন যেন তারা পরে বাধা না দেন। হজের মৌসুমে মানুষ এসে এক স্থানে জমায়েত হত। আবু বকর রা.-কে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সা. সেখানে যান এবং সকলের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন, হে লোকসকল! আমি তোমাদের কাছে প্রেরিত আল্লাহর রাসুল। আমি তোমাদেরকে আহ্বান করছি যে তোমরা আল্লাহ ইবাদত করো। তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক কোরো না। আল্লাহ ছাড়া যা কিছুকে তোমরা উপাসনা করছ সেগুলোকে পরিত্যাগ করো। তোমরা আমার প্রতি ঈমান আনো। আমাকে আমার রবের বার্তা প্রচারে বাধা দিও না।

 

তিনি আরও বলছিলেন, কে আমাকে আমার রবের বার্তা পৌঁছে দিতে সহযোগিতা করবে? হে মানুষ! তোমরা বলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তাহলে তোমরা সফল হতে পারবে।

 

যখন রাসুলুল্লাহ সা. সমবেত মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন তখন আবু লাহাব পেছন থেকে বলছিল, এই লোক যেন তোমাদেরকে তোমাদের ধর্ম সম্পর্কে ধোঁকা না দেয়। সে তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার ধর্ম থেকে দূরে সরাতে চায়। তারা লাত-উজ্জা থেকে তোমাদেরকে দূরে রাখতে চায়। তোমাদের জ্বিন উপাস্যদের থেকে দূরে সরাতে চায়। সে নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছে। তোমরা তাকে মেনো না, তার কথা শোনো না।

 

উপস্থিত লোকরা তো ছিল মক্কার বাইরে থেকে আসা। তাদের বেশিরভাগই আবু লাহাবকে চিনত না। তারা বলত, এই লোকটি কে যে মুহাম্মদ সা.-এর পিছু পিছু চলছে এবং তার কথার বিরুদ্ধে কথা বলছে? যারা আবু লাহাবকে চিনত তারা বলত, সে তার চাচা আবু লাহাব।

 

রাসুলুল্লাহ সা. এসময় উপস্থিত গোত্রগুলোর কাছে আলাদা আলাদাভাবে যান। বনু কিনদাহ গোত্র তাঁর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে। বনু কালবও দাওয়াত গ্রহণ করেনি। বনু হানিয়া মন্দভাবে প্রতিউত্তর দেয়। বনু আমির ইবনে সা’সা’ গোত্রকে দাওয়াত দেয়ার পর বুহাইরা নামের একজন বলেছিল, আচ্ছা, যদি আমরা আপনার অনুসরণ করি এবং আপনি আপনাদের শত্রুদের ওপর বিজয়ী হন তাহলে কি আল্লাহ আপনাকে শাসন ক্ষমতা দান করবেন? তখন রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে শাসন ক্ষমতা দেন। তখন লোকটি বলল, আমরা এখন আমাদের ঘাড়কে আরবদের নিশানা বানাব আর আপনি বিজয়ী হলে অন্য কারো হাতে ক্ষমতা যাবে? তাহলে আর আপনার কথা মানার দরকার নেই।

 

এরপর বনু আমের যখন নিজেদের এলাকায় ফিরে যায় তখন তাদের মধ্যে অভিজ্ঞ ও প্রবীণতম ব্যক্তিকে এই ঘটনা জানায়। তখন তিনি মাথায় হাত রেখে আফসোস করে বলেন, তোমরা তার কথা মেনে নিলেই ভালো হত। কারণ তাঁর আগে বনু ইসমাইলের কেউ নবি দাবি করেননি। কিন্তু ততদিনে তারা মক্কা থেকে অনেক দূরে তাদের এলাকায় পৌঁছে গিয়েছিল।

 

প্রথমদিকে উল্লিখিত গোত্রগুলো ইসলাম গ্রহণে অসম্মতি জানালেও রাসুলুল্লাহ সা. কিন্তু তাঁর দাওয়াত থেকে বিরত হননি। তিনি অবিরত দাওয়াত দিয়ে গেছেন। যারাই মক্কায় আসত তাদের কাছে রাসুলুল্লাহ সা. ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যেতেন। তিনি বলতেন, আমি তোমাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করছি তবে তোমাদেরকে বাধ্য করছি না। যে স্বেচ্ছায় চাইবে সেই ইসলাম গ্রহণ করতে পারবে। যে চাইবে না তাকে আমি বাধ্য করব না। তবে আমি শুধু চাই, তোমরা আমাকে সমর্থন করো যেন আমাকে ও আমার সঙ্গীদেরকে যারা হত্যা করতে চায় তারা যেন তা করতে না পারে।

 

সে সময় অনেকেই রাসুলুল্লাহ সা.-এর দাওয়াত গ্রহণ করেনি। তারা বলত, কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে তার গোত্রই সবচেয়ে ভালো জানে। এমন লোক সম্পর্কে তোমাদের কী মত যে আমাদেরকে সংশোধন করতে চায় অথচ সে তার গোত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে এবং তারা তাকে কটু কথা বলে!

 

এখানে আমাদের জন্য লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, রাসুলুল্লাহ সা. ইসলামের দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ কৌশল ব্যবহার করেননি। পৃথিবীতে যখন কেউ কিছু প্রচার করে তখন তারা চায় যেকোনো মূল্যে মানুষ তাদের মত গ্রহণ করুক। এজন্য তারা অনেক কিছু বানিয়েও বলে থাকে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. ইসলামের বাণী প্রচার করেছেন নির্মোহভাবে। তিনি দাওয়াত দিয়েছেন আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য। কাউকে হেদায়েত দেয়া তাঁর ক্ষমতায় ছিল না। কে ইসলাম গ্রহণ করল আর কে করল না সেটাও তিনি দেখেননি। মহান আল্লাহ যা বলেছেন তার বাইরে কিছুই করেননি।

 

যদি নেতৃত্ব লাভ করা তাঁর উদ্দেশ্য থাকত তাহলে খুব সহজেই তিনি মানুষকে নিজের অধীনে আনতে পারতেন। কুরাইশরা তাঁকে সে প্রস্তাবও দিয়েছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন মহান আল্লাহর একজন রাসুল। এই বিষয়টিই তাঁর নবুয়তের বড় প্রমাণ। কারণ তিনি ইসলাম প্রচারের বিনিময়ে কারো কাছে কখনো কিছু চাননি।

মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।

 

লেখক: নাজমুস সাকিব


প্রকাশের তারিখ : ৪ আগস্ট ২০২৪

শেয়ার করুন :

Currently Reading

হজের মৌসুমে অন্যান্য গোত্রে ইসলামের দাওয়াত

Contact Us

,

Design & Developed by Neoscoder © 2026 - All right reserved by Ampublications

  • Privacy Policy
  • Terms & Conditions
  • Help & Support