গারে সাওরে তিনদিন

মক্কার অদূরে যে পাহাড়ে রাসুলুল্লাহ সা. এবং আবু বকর রা. আত্মগোপন করেছিলেন তার নাম ছিল সাওর। গার শব্দের অর্থ গুহা। তারা দুজন সাওর পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে একে গারে সাওর বলা হয়।

 

কাফিররা গারে সাওরের একদম কাছে এসেও ফিরে গিয়েছিল। তারা গুহার ভেতর থাকা রাসুলুল্লাহ সা. এবং আবু বকর রা. কে দেখতে পায়নি।

 

তারা চলে যাবার পর রাতের বেলা আবু বকর রা. এর ছেলে আব্দুল্লাহ গারে সাওরে আসেন। সারাদিন মক্কার কাফিররা তাদের সম্পর্কে যা কিছু বলাবলি করেছে তা নিয়ে তারা আলোচনা করেন। সেসময় রাসুলুল্লাহ সা. এর পক্ষ থেকে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছিলেন আব্দুল্লাহ রা.। তখন তিনি বয়সে টগবগে তরুণ। রাতের বেলা অন্ধকারে লুকিয়ে তিনি আসতেন গারে সাওরে। সেখানে অবস্থান করতেন এবং কাফিরদের পরের দিনের পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাদের দুজনকে অবহিত করতেন। আবার ভোরের আলো ফোটার আগে তিনি চলে যেতেন মক্কা শহরের ভেতরে। সবাই ভাবত তিনি রাতের বেলা মক্কায়ই ছিলেন।

 

সে যুগে আজকের মত সিসিটিভি বা কারও গতিবিধি লক্ষ্য করার মত কোনো প্রযুক্তিই ছিল না। তবু মানুষ নজরদারি করতে পারত নানা উপায়ে। তাই কারও চোখকে ফাঁকি দেয়া খুব সহজ কিছু ছিল না।

 

আরবে নজরদারির একটি মাধ্যম ছিল পায়ের ছাপ অনুসরণ। বালুতে উট বা ঘোড়া নিয়ে চললে পায়ের ছাপ পড়ে যায়। আব্দুল্লাহ রা. যখন রাতের বেলা গারে সাওরে যেতেন তখন পায়ের ছাপ পড়ত। আবার সকাল বেলা যখন ফিরতেন তখনও পায়ের ছাপ থাকত বালুর ওপর। এতে করে সহজেই কাফিরদের হাতে ধরা পড়ে যাবার আশংকা ছিল।

 

এক্ষেত্রে আবু বকর রা. এর গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা রা.কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি প্রতিদিন দুবার গারে সাওরের কাছে ছাগল চড়াতে যেতেন। প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় ছাগলের দুধ নিয়ে যেতেন রাসুলুল্লাহ সা. এবং আবু বকর রা. এর কাছে। সামান্য দুধ খেয়েই তারা তিনদিন অতিবাহিত করেন। আমের ইবনে ফুহাইরা রা. যখন গারে সাওরে যাওয়া আসা করতেন তখন আব্দুল্লাহ রা. এর পায়ের চিহ্ন মুছে দিতেন। আর তিনি তো ছিলেন গোলাম। প্রায়ই শহরের আশেপাশে ছাগল চরাতে যান। তাওই তার গতিবিধি নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি।

 

এভাবে মহান আল্লাহর রহমতে তিনরাত ও দুইদিন কেটে যায়। তৃতীয় দিন ভোরে তাঁরা রওয়ানা হন মদিনার পথে। আবু বকর রা. তার প্রস্তুত রাখা দুটি বাহনের একটি রাসুলুল্লাহ সা. কে গ্রহণ করার অনুরোধ করেন। রাসুলুল্লাহ সা. মূল্যের বিনিময়ে রাজি হন। এখানে লক্ষ্যণীয়, এমন অবস্থায়ও রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর প্রিয় বন্ধুর কাছ থেকে বিনিময় ছাড়া বাহন গ্রহণ করতে রাজি হননি। অথচ হাদিয়া দেয়া বা নেয়া তাঁরই সুন্নত।

 

রাসুলুল্লাহ সা. এবং আবু বকর রা. কে মদিনায় পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে একজন পথপ্রদর্শক বা গাইড নির্ধারণ করা হয়। তার নাম ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত।

 

সেসময় দূরের ভ্রমণ হতো দলবেঁধে কাফেলার সাথে। তাদের চলার পথ জানা থাকত। অল্প কজন হলে পথ প্রদর্শকের দরকার হতো। আবার মক্কায় কাফিররা যেভাবে রাসুলুল্লাহ সা. এবং আবু বকর রা. কে খুঁজছিল, তাতে কাউকে বিশ্বাস করা ছিল খুবই কঠিন কাজ। কারণ কাফিররা ততদিনে মোটা অংকের পুরষ্কার ঘোষণা করেছিল রাসুলুল্লাহ সা. এবং আবু বকর রা. কে ধরিয়ে দেবার জন্য।

 

তবু আব্দুল্লাহ রা. গাইড হিসেবে আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিতকে বিশ্বাস করেছিলেন। কাফির হলেও তাকে বিশ্বাস করবার মত যথেষ্ট কারণ ছিল। প্রথমত ব্যক্তিগতভাবে আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত ছিলেন বিশ্বস্ত। পাশাপাশি তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ গাইড। মক্কা থেকে মদিনার প্রচলিত রুট ছাড়াও অন্য অনেক রুট তার জানা ছিল।

 

মদিনার পথে রওয়ানা হওয়া ছোট্ট এই কাফেলায় সংখ্যা ছিল মাত্র চারজন। রাসুলুল্লাহ সা., তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী আবু বকর রা., আমের ইবনে ফুহাইরা রা. এবং গাইড আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত।

 

যাতুন নিতাকাইন

হিজরতকালীন সময়ে আবু বকর রা. নিজে শুধু রাসুলুল্লাহ সা. এর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন তা নয়। আবু বকর রা. এর কন্যা আসমা রা. এর ত্যাগের কথাও এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

আসমা রা. তখন তরুণ বয়সের। তাঁর বিয়েও হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সা. কে মক্কায় না পেয়ে কাফিররা প্রথমে আলি রা. কে টানা হেঁচড়া করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার কাছ থেকে কোনো সংবাদ না পেয়ে আবু জাহল হানা দেয় আবু বকর রা. এর বাড়িতে। আসমা রা. কে দেখে সে এত জরে চড় দেয় যে তার কানের দুল ছিঁড়ে যায়। অথচ সেসময়ের আরব সমাযে সম্ব্রান্ত স্বাধীন কোনো নারীর গায়ে হাত তোলা ছিল ভদ্রতা ও সামাজিক রীতিবিরুদ্ধ। তার ওপর তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের নারী। এটি ছিল রাসুলুল্লাহ সা. ও আবু বকর রা. এর জন্য আসমা রা. এর ত্যাগ স্বীকার।

 

আবু বকর রা. বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবার পর তাঁর বৃদ্ধ পিতা আবু কুহাফা ছেলের জন্য আফসোস করছিলেন। বয়সের ভারে তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গিয়েছিল।

 

তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। আবু বকর রা. যাবার সময় তার জমানো অর্থ নিয়ে যান। কারণ হিজরতের যাত্রাপথে এবং মদিনায় যাবার পর অবশ্যই অর্থের প্রয়োজন হবে। আবু বকর রা. চলে যাবার পর আবু কুহাফা আফসোস করতে থাকেন। তিনি নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যত নিয়ে খুবই চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। আসমা রা. দাদাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য একটি উপায় বের করলেন তখন। তিনি কিছু পাথর ঘরের কোণে কাপড় দিয়ে ঢেকে তারপর দাদাকে বললেন, এই দেখুন, বাবা আমাদের জন্য তার সব অর্থ রেখে গেছেন। আবু কুউহাফা হাতড়ে দেখলেন কাপড় দিয়ে কিছু ঢেকে রাখা হয়েছে। তিনি ভাবলেন এটাই হয়ত তার ছেলের রেখে যাওয়া অর্থ।

 

আরেকটি ঘটনার কারণে আসমা রা. ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। যখন তিনি আবু বকর রা. ও রাসুলুল্লাহ সা. কে বিদায় দেয়ার সময় তাদের মালপত্র বেঁধে দিচ্ছিলেন তখন দরকার হলো একটি রশির। হাতের কাছে রশি না পেয়ে তিনি নিজের কোমর বন্ধনীকে দু ভাগে ছিঁড়ে একভাগ দিয়ে মালপত্র বেঁধে দেন। রাসুলুল্লাহ সা. এই দৃশ্য দেখে তাকে বলেছিলেন যাতুন নিতাকাইন তথা দুই কোমর বন্ধনী বিশিষ্টা।

 

হিজরতের আগে গারে সাওরে যে কয়দিন রাসুলুল্লাহ সা. অবস্থান করেছিলেন সে কয়দিন আবু বকর রা. ও তার পরিবারের ত্যাগ ছিল উল্লেখযোগ্য।

 

লেখক: নাজমুস সাকিব


প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪

শেয়ার করুন :

Currently Reading

গারে সাওরে তিনদিন

Contact Us

,

Design & Developed by Neoscoder © 2026 - All right reserved by Ampublications

  • Privacy Policy
  • Terms & Conditions
  • Help & Support