দ্বিতীয় হিজরির যুদ্ধ ও প্রতিরোধ
বদর যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা. এর বিজয়ের প্রভাব ছিল অপরিসীম। এটি ছিল ইসলামের প্রথম যুদ্ধ। এতে মক্কার কাফিরদের বড় বড় নেতাদের বেশিরভাগ নিহত হয়ে যায়। এতে করে মুসলমানরা আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
মদিনার ইহুদি আর মুনাফিকরা অবশ্য এই যুদ্ধে মনক্ষুণ হয়। তারা ভেবেছিল, প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় যুদ্ধ করে মুসলমানরা হয়ত পরাজিত হবে। এরপর ইসলাম আর মদিনায় টিকবে না। কিন্তু মহান আল্লাহ তো উত্তম পরিকল্পনাকারী। তিনি মুসলমানদেরকে এক অভূতপূর্ব বিজয় দান করেছিলেন।
কুদরের যুদ্ধ
বদর যুদ্ধের পর দ্বিতীয় হিজরিতে আরেকটি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন রাসুলুল্লাহ সা.। এই যুদ্ধটি ছিল বনু সুলাইমের সাথে। কুদর নামের একটি জায়গায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তারা মদিনায় হামলা করার জন্য বিভিন্ন গোত্র থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে শুরু করে। এই খবর পেয়ে রাসুলুল্লাহ সা. দুইশত জনের একটি বাহিনী নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন।
বনু সুলাইমের লোকেরা এই আকস্মিক অভিযানের জন্য প্রস্তুত ছিল না। কারণ এই ঘটনা ঘটেছিল বদর যুদ্ধের মাত্র সাতদিন পর। রাসুলুল্লাহ সা. এর অভিযানের খবর পেয়ে তারা পালিয়ে যায় এবং প্রায় পাঁচশ উট ফেলে যায়। বিনাযুদ্ধে মুসলমানরা এতগুলো উট গণিমত হিসেবে পেয়ে যান।
বনু কায়নুকার যুদ্ধ
পরবর্তী যুদ্ধ হয়েছিল ইহুদি গোত্র বনু কায়নুকার সাথে। আমরা আগে জেনেছি, মদিনায় আসার পর রাসুলুল্লাহ সা. ইহুদিদের সাথে সন্ধি করেছিলেন। তিনি আনসারদের দুটি গোত্র তথা আওস ও খাযরাজের মধ্যে বিবাদ নিরসন করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু ইহুদিরা আরবদের এই ঐক্য মেনে নিতে পারেনি। তারা আওস ও খাযরাজের পুরনো যুদ্ধের ঘটনাগুলোকে মনে করে তাদের সামনে সেসব কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করে। এভাবে আওস ও খাযরাজের মধ্যে আবার বিবাদ শুরু হয়ে যায়। এ অবস্থা দেখে রাসুলুল্লাহ সা. তাদেরকে সতর্ক করেন এবং বলেন, তোমরা কি আবার জাহিলিয়াতের দিকে ফিরে যাচ্ছ?
কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সবসময় তৎপর ছিল। বিশেষ বনু কায়নুকা। তারা ছিল স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও কামার। থালা-বাসন ও যুদ্ধের সরঞ্জাম তারা তৈরি করত।
একদিন এক ইহুদি স্বর্ণ ব্যবসায়ী একজন মুসলিম নারীর শ্লীলতাহানি করে। এরপর উপস্থিত মুসলিমরা ওই ইহুদিকে মেরে ফেলে। তখন ইহুদির পক্ষের লোকজনও মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করে এবং একজনকে হত্যা করে।
চুক্তি অনুযায়ী এই ঘটনার বিচারের ভার রাসুলুল্লাহ সা. কে দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু ইহুদিরা তা না করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তখন রাসুলুল্লাহ সা. সাহাবিদের নিয়ে তাদের দূর্গ অবরোধ করেন। ১৫ দিন অবরোধের পর তারা আত্মসমর্পণ করে এবং তারা রাসুলুল্লাহ সা. এর বিচার মেনে নিতে রাজি হয়। চুক্তি ভঙ্গকারী হিসেবে তাদের পুরুষদের হত্যা করাটাই ছিল স্বাভাবিক। রাসুলুল্লাহ সা. ও তা করতে চেয়েছিলেন। তবে মুনাফিকদের সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তাদেরকে রক্ষা করার জন্য রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে সুপারিশ করে।
প্রথমে রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর সুপারিশ গ্রহণ করেননি। কিন্তু সে অনেক জোর করে। এমনকি তাঁর জামার হাত ধরে টান দেয়। অবশেষে রাসুলুল্লাহ সা. তার সুপারিশ গ্রহণ করেন। তবে তিনি তাদেরকে মদিনা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ইহুদিরা মদিনা ছেড়ে যাবার সময় অনেক সম্পদ ও অস্ত্র রেখে যায়। সেগুলো মুসলমানরা গনিমত হিসেবে নিয়ে নেন।
রাসুলুল্লাহ সা. কে হত্যাচেষ্টা
বদর যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি কাফিররা সহজে ভুলতে পারেনি। তারা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নানা ফন্দি করতে থাকে। মক্কার এক কাফির রাসুলুল্লাহ সা. হত্যার ষড়যন্ত্রও করে। এই লোকটির নাম ছিল ওমায়ের। সে মক্কার এক সর্দার সাফওয়ানের সাথে একদিন কাবার হাতিমে বসে বলেছিল, যদি আমার ঋণ না থাকত এবং পরিবারের চিন্তা না থাকত তাহলে আমি মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদকে হত্যা করতাম। (নাউযুবিল্লাহ)
একথা শুনে সাফওয়ান উমায়েরে সব দায়িত্ব নিয়ে নেয় এবং তাকে মদিনায় গিয়ে তার এই ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বলে।
ওমায়ের একটি তরবারিতে বিষ মাখিয়ে মদিনায় চলে যায়। তখনও বদর যুদ্ধের বন্দীরা মদিনায় ছিল। ওমর রা. তার গলায় তরবারি দেখে বুঝতে পারেন যে সে কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে এসেছে। তিনি তাকে ধরে রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে নিয়ে যান। রাসুল সা. ওমায়েরকে তার আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করেন। জবাবে ওমায়ের বলে, আমি যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে আলোচনা করতে এসেছি। কিন্তু মহান আল্লাহ রাসুল সা. কে আগেই অহির মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছিলেন তার ও সাফওয়ানের ষড়যন্ত্রের কথা। রাসুলুল্লাহ সা. তাকে সেইকথা মনে করিয়ে দিতেই যে বুঝে ফেলে যে ইনি সত্যিই আল্লাহর রাসুল। তখনই ওমায়ের ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুসলিম হয়ে মক্কায় ফিরে যান।
ওদিকে মক্কায় থাকা আরেক ষড়যন্ত্রকারী সাফওয়ান অপেক্ষায় ছিল ওমায়েরের। সে ভেবেছিল মদিনা থেকে হয়ত এখনই সুসংবাদ আসবে। কিন্তু সে যখন জানতে পারল, ওমায়ের ইসলাম গ্রহণ করেছেন তখন সে তার সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলল।
লেখক: নাজমুস সাকিব
প্রকাশের তারিখ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪
শেয়ার করুন :
Currently Reading
