দ্বিতীয় হিজরির নানা ঘটনা

রাসুলুল্লাহ সা. মদিনায় হিজরতের প দ্বিতীয় বছরের সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল বদর যুদ্ধ। এই যুদ্ধের বিষয়ে গত দুটি পর্বে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

 

এছাড়া দ্বিতীয় হিজরিতে ইসলামের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান আল্লাহ নাযিল করেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো, রোযা, যাকাত, ঈদ ও কিবলা পরিবর্তন। এই পর্বে আমরা ইসলামের গুরুতপূর্ণ বিধানগুলো কোন প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয়েছিল সে সম্পর্কে জানব।

 

কিবলা পরিবর্তনের ঘটনা

রাসুলুল্লাহ সা. যখন মক্কায় ছিলেন তখন তিনি বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে নামায পড়তেন। বাইতুল মাকদিস হলো ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র অঞ্চল যেখানে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ইসহাক আলাইহিস সালামকে নিয়ে আল মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেছিলেন।

 

কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. এর মনের ইচ্ছা ছিল কাবা কিবলা হোক। এ কারণে নামাযের মধ্যে তাঁর দৃষ্টি প্রায়ই আসমানের দিকে চলে যেত। তবে মক্কায় থাকতে কিবলা পরিবর্তনের বিধান অবতীর্ণ করা হয়নি।

 

এর পেছনে অবশ্য মহান আল্লাহর বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। কারণ মক্কা কাফিরদের কাছে কাবা ছিল পবিত্র। তারা কাবা তাওয়াফ করত। যদি সেসময় আল্লাহ কাবাকে কিবলা বানিয়ে দিতেন তাহলে নিশ্চই কুরাইশের কাফিররা বলত, মুহাম্মদ আমাদের কাবাকে কিবলা বানিয়েছে। অচিরেই সে আমাদের ধর্মও মানতে শুরু করবে।

 

একই বিষয় ঘটেছিল মদিনায় হিজরতের পর। মদিনার ইহুদিরা বলত, মুহাম্মদ ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশের হলেও সে ইসহাক আলাইহিস সালামের কিবলা অনুসরণ করে। সে শীঘ্রই আমাদের ধর্মের অনেক বিষয় মেনে নিবে।

ইহুদিদের এই ধারণাকে নির্মূল করতে মহান আল্লাহ মদিনার জীবনের প্রায় প্রথম দিকেই কিবলা পরিবর্তনের আয়াত অবতীর্ণ করেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

 

অচিরেই নির্বোধ লোকেরা বলবে, কী তাদেরকে তাদের কিবলা থেকে ঘুরিয়ে দিল যার ওপর তারা ছিল? আপনি বলে দিন, আল্লাহরই জন্য পূর্ব ও পশ্চিম। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকে হেদায়াত দান করেন সরল পথের দিকে। [সুরা বাকারা: ১৪২]

 

আমি অবশ্যই দেখেছি আপনার আসমানের দিকে বার বার মুখ ফেরানোকে। অবশ্যই আমি আপনাকে ফিরাব এমন কিবলার দিকে যা আপনি পছন্দ করেন। সুতরাং আপনি আপনার মুখকে মসজিদুল হারামের দিকে ঘুরিয়ে দিন। আর তোমরা যেখানেই থাকো তাঁর দিকেই তোমাদের মুখ ফেরাও। আর যাদেরকে কিতাবের জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা অবশ্যই জানে যে তা তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য এবং আল্লাহ তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে উদাসীন নন। [সুরা বাকারা : ১৪৪]

 

সুরা বাকারায় কিবলা পরিবর্তন সম্পর্কিত বেশ কিছু আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। এসব আয়াতের মাধ্যমে সেদিন থেকে কিবলা পরিবর্তন হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সা. এবং সাহাবিরা বাইতুল মাকদিসের পরিবর্তে কাবার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে শুরু করেন।

 

কিবলা পরিবর্তন হয়েছিল আসরের সময়। কিন্তু বনু সালামায় সে সংবাদ তখনো পৌঁছেনি। পরদিন ফজরের সময় বনু সালামার মসজিদে লোকজন সালাত আদায় করছিলেন। যখন প্রথম রাকাত শেষ হয়ে সবাই দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়াবেন তখন একজন সাহাবি এসে ঘোষণা দেন, কিবলা পরিবর্তন করা হয়েছে। সবাই কাবার দিকে মুখ করে নামায পড়ুন। অমনি নামাযরত সকল সাহাবি কাবার দিকে ঘুরে গেলেন এবং ইমামও তার জায়গা পরিবর্তন করে বাকি নামায পড়ালেন।

 

কিবলা পরিবর্তনের প্রভাব

মহান আল্লাহ কিবলা পরিবর্তনের  মাধ্যমে কারও কারো ঈমান পরীক্ষা করেছিলেন। কারণ উপরোক্ত আয়াতে বলাই হয়েছে যে পূর্ব পশ্চিম আল্লাহর জন্য। যেদিকেই মুখ ফেরানো হোক না কেন সবই তো আল্লাহর। একদিকে কিবলা নির্দিষ্ট করে দেয়া তো মূলত আল্লাহর আদেশ কারা পালন করে তা দেখার জন্য। এজন্য সুরা বাকারার  ১৪১ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দিয়েছেন, তারা ছাড়া অন্যদের জন্য বিষয়টি অনেক গুরুতর। যারা দ্বিধাহীন মনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সা. এর আনুগত্য করবে তাদের জন্য কিবলা পরিবর্তন কিছুই নয়। কিন্তু যাদের অন্তরে মুনাফিকি আছে তারা এটাকে অনেক বিষয় মনে করবে।

 

কিবলা পরিবর্তনের পর তা-ই ঘটেছিল। কিছু লোক তা মেনে নিতে পারেনি। তারা নিজেদের ধর্মে ফিরে যায়। কেউ কেউ মনক্ষুণ্ণ হয়। এর মাধ্যমে কারা সত্যি আল্লাহর রাসুল সা. এর অনুসরণ করে আর কারা নিজেদের মনের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

 

রোযা, যাকাত ও ঈদ

দ্বিতীয় হিজরিতে ইসলামের দুটি প্রধান স্তম্ভ তথা রোযা ও যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হয়। সিয়াম তথা রোযার বিধান এসেছিল চারটি ধাপে।

 

প্রথমদিকে শুধুমাত্র আশুরার রোযা ফরয ছিল। এরপর রামাদানের রোযা ফরয করা হয়। তখন যারা রোযা রাখবে না তাদের জন্য ফিদিয়ার সুযোগ দেয়া হয়। অর্থাৎ কেউ চাইলে কোনো কারণ ছাড়াই রোযা না রেখে ফিদিয়া দিতে পারবে।

 

এরপর তৃতীয় ধাপে রোযাকে সুস্থ সবল প্রাপ্ত বয়স্ক এবং মুসাফির অবস্থায় নেই এমন প্রত্যেকের জন্য ফরয করে দেয়া হয়। তবে তখন রোযার বিধান একটু কঠিন ছিল। কারণ ইফতারের পর ঘুমানোর আগ পর্যন্ত খাবার গ্রহণের অনুমতি ছিল। অর্থাৎ রাতের বেলা ঘুমানোর আগ পর্যন্ত পানাহার করা যেত। ঘুমিয়ে গেলে এরপর আর পানাহারের সুযোগ ছিল না। এটি মানা সাহাবিদের জন্য একটু কষ্টের ছিল।

চতুর্থ পর্যায়ে ভোর পর্যন্ত পানাহারের অনুমতি দেয়া হয়। এভাবে রোযার বিধান পূর্ণতা লাভ করে।

 

যাকাত ও সাদাকাতুল ফিতর

একই বছর যাকাত ফরয করা হয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে যাকাতের আদেশ দেন।

আপনি তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা গ্রহণ করুন যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন। [সুরা তাওবা: ১০৩]

 

এই আয়াতে রাসুলুল্লাহ সা. কে আদেশ করা হয়েছে যাকাত উসুল করার জন্য। কাদেরকে যাকাত দিতে হবে তা মহান আল্লাহ অন্য একটি আয়াতে বলেছেন। এরপর থেকে রাসুলুল্লাহ সা. যাকাত উসুল করতে শুরু করেন এবং তা দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করতে থাকেন। এভাবে যারা দরিদ্র সাহাবি ছিলেন তারা স্বাবলম্বী হতে শুরু করেন। শুধু তাই নয়, সেসময় অমুসলিমদেরকেও ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য যাকাত দেয়া হত। এর মাধ্যমে মদিনায় একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু হয়।

একই বছর রামাদানের পর সাদাকাতুল ফিতরের বিধান দেয়া হয়।

 

দুই ঈদের বিধান

মক্কার জীবন ছিল দুঃখ কষ্ট ও ভয়ের। সেখানে মন খুলে আল্লাহর ইবাদত করাই অসম্ভব ছিল। মদিনায় কোনো ভয় ছিল না। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনায় এসে দেখলেন, সেখানকার জাহিলি যুগের লোকেরা নানা উৎসব পালন করে। কিন্তু ইসলামে তো আর জাহিলি যুগের কোনো কিছুকে অনুসরণ করা হয়নি। তাই প্রথমদিকে মুসলমানদের কোনো উৎসব ছিল না। অথচ জীবনে আনন্দ উৎসবের প্রয়োজনীয়তাও আছে।

 

জাহিলি যুগের উৎসবের বদলে মহান আল্লাহ মুসলিমদেরকে দুটি উৎসবের দিন তথা ঈদের দিন দিলেন। এই উৎসব অন্য সকল উৎসবের থেকে আলাদা। এই দিন মুসলমানরা আল্লাহর নামে তাকবির দেন এবং আল্লাহর আদেশে আনন্দ উদযাপন করেন।

ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো হিজরতের দ্বিতীয় বছর প্রবর্তিত হয়েছিল।

 

লেখক: নাজমুস সাকিব


প্রকাশের তারিখ : ৮ ডিসেম্বর ২০২৪

শেয়ার করুন :

Currently Reading

দ্বিতীয় হিজরির নানা ঘটনা

Contact Us

,

Design & Developed by Neoscoder © 2026 - All right reserved by Ampublications

  • Privacy Policy
  • Terms & Conditions
  • Help & Support