বনু নাযির ও দ্বিতীয় বদরের যুদ্ধ
চতুর্থ হিজরিতে রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার ইহুদি গোত্র বনু নাযিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন।
আমরা আগেই জেনেছি, মদিনায় এসেই রাসুল সা. ইহুদিদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করেন। এই চুক্তির মূল দাবি ছিল, কারও বিরুদ্ধে কেউ যুদ্ধ করবে না এবং এবং রক্তপণের ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। ইহুদিদের মধ্য ধূর্ত ও কপট জাতির জন্য এই চুক্তি মেনে চলা অবশ্য বেশ কঠিন ছিল।
এর আগে বনু কায়নুকাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল মদিনা থেকে। তাদের একজন নেতা কাব বিন আশরাফকে হত্যা করা হয়েছিল রাসুল সা. এর বিরুদ্ধে কটুক্তি করার কারণে।
এসব ঘটনায় স্বাভাবিকভাবে ইহুদিরা ভয় পেয়ে কিছুদিন চুপ ছিল। এরপর উহুদ ও বীরে মাউনা ও রাজির ঘটনায় অনেকজন সাহাবি শহীদ হওয়ায় তারা আবার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে।
তারা মক্কার মুশরিকদের সাথে যোগাযোগ শুরু করে। রাজির অভিযান থেকে বেঁচে ফেরার পথে আত্মরক্ষার জন্য একজন সাহাবি ভুলে দুজনকে হত্যা করেন যাদের সাথে মুসলমানদের গোত্রের মিত্রতা ছিল। তাদের জন্য রাসুল সা. মুক্তিপণ সংগ্রহ করতে শুরু করেন।
বনু নাযির এতে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায়। এ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য রাসুল সা. কয়েকজন সাহাবিকে নিয়ে তাদের কাছে যান। তারা প্রথমে রাসুল সা. এর নির্দেশ মেনে নেয় এবং নিজেরা আলোচনা করার জন্য সময় চায়। তাদেরকে সময় দিয়ে রাসুল সা. একটি দেয়ালের পাশে বসে অপেক্ষা করছিলেন।
এসময় দেয়ালের অপর পাশ থেকে পাথর ফেলে ইহুদিরা রাসুল সা. কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু মহান আল্লাহ এ কূটকৌশলের কথা রাসুল সা. কে জানিয়ে দিলে তিনি সেখান থেকে নিরাপদে চলে আসেন এবং মদিনায় এসে তাদেরকে চুক্তি ভঅঙের অপরাধে মদিনা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন।
ইহুদিরা প্রথমে ভয় পেয়ে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু মুনাফিকদের সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তাদেরকে এ সিদ্ধান্ত মানতে নিষেধ করে এবং তাদেরকে তার গোত্র ও অন্যান্য মিত গোত্রের মাধ্যমে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
তাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে ইহুদিরা রাসুল সা. এর নির্দেশ অমান্য করে। রাসুল সা. তাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য বাহিনী নিয়ে চলে আসেন। তারা তাদের দুর্গে আশ্রয় নেয়।
প্রায় সপ্তাহখানেক দুর্গে অবরুদ্ধ থাকার পর তারা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে চলে যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেন। কেউ কেউ অন্যান্য ইহুদি গোত্রে আশ্রয় নেয়। বাকিরা সিরিয়ার পথে চলে যায়।
বনু নাযির থেকে গণিমত হিসেবে মুসলমানরা যে সম্পদ পেয়েছিলেন তা অন্য যুদ্ধের গণিমতের মত ছিল না। কারণ এখানে যুদ্ধ ছাড়াই সম্পদ হস্তগত হয়েছিল। কুরআনে একে উল্লেখ করা হয়েছে ফাই বলে।
এই সম্পদ থেকে কিছু অংশ রাসুল সা. প্রথমদিকে হিজরতকারী মুহাজির ও কয়েকজন দরিদ্র সাহাবিকে দান করেন। কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে দিয়েছিলেন যা দিয়ে তাঁর পরিবার তথা স্ত্রীদের ভরণপোষণ চলত। এভাবে প্রায় বিনাযুদ্ধে মহান আল্লাহ বনু নাযিরের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেন।
দ্বিতীয় বদরের যুদ্ধ
উহুদ যুদ্ধ শেষে আবু সুফিয়ান ঘোষণা দিয়েছিল যে আগামী বছর বদরে তারা আবার মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে আসবে।
কারণ উহুদ যুদ্ধে কাফিররা আসলে পরাজিতই হয়েছিল। শুধুমাত্র মুসলমানদেরকে বিপর্যস্ত করতে পেরেছিল শুধু।
তবে এই বছর যুদ্ধ করতে মক্কার কাফিররা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। কারণ এর আগে দুবার যুদ্ধ করে তাদের কোনো লাভ হয়নি। মহান আল্লাহ ইসলামকে টিকিয়ে রেখেছেন এবং মদিনায় রাসুলুল্লাহ সা. এর কর্তৃত্ব আরও বেড়েছিল।
তবু নিজেদের কথা রক্ষায় তারা তাদের বাহিনী নিয়ে বদরের দিকে রওয়ানা হয়। রাসুলুল্লাহ সা. প্রায় দেড় হাজার সৈন্যের বাহিনী নিয়ে বদরের দিকে যাত্রা করেন। মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে আবু সুফিয়ানের মনে কাঁপুনি ধরে যায়। সে তার সঙ্গীদের জানায়, এ বছর শুষ্ক মওসুম। উট বা ঘোড়া যদি ঘাস না পায় তাহলে যুদ্ধ করে সুবিধা করা যাবে না। তাছাড়া গত দুটি যুদ্ধে মুসলমানদের তেমন কোনো ক্ষতিই করা যায়নি। তাই এবার ফিরে চলো। পরে আবার আমরা যুদ্ধ করতে আসব।
তার এই প্রস্তাব কাফিররা মেনে নিয়েছিলে। যুদ্ধ না করেই তারা ফিরে যায় মক্কার পথে। রাসুল সা. ও বিজয়ীর বেশে মদিনায় ফিরে আসেন।
লেখক: নাজমুস সাকিব
প্রকাশের তারিখ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
শেয়ার করুন :
Currently Reading
