বাইয়াতুল আকাবা

পরের বছর মদিনা থেকে আরও বেশি সংখ্যক হাজি হজ করতে মক্কা আসেন। আগের বছর যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্য থেকে ছয়জন এবং আরও ছয়জনসহ মোট বারোজন রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে দেখা করেন। এবার যারা এসেছিলেন তাদের মধ্যে খাযরাজ গোত্রের লোকের সংখ্যা বেশি হলেও আওস এবং আরেকটি গোত্র বনু আব্দিল আশহালের দুজন করে ব্যক্তি ছিলেন।

 

মক্কায় এসে তারা রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে দেখা করেন এবং তাঁর হাতে হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণ করেন। বাইয়াত মানে আনুগত্যের শপথ। উক্ত বারোজনের মধ্যে একজন ছিলেন উবাদা ইবনে সামিত রা.। পরবর্তীতে তার বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে আমরা এই বাইয়াতের কথা জানতে পারি।

 

তিনি বলেন, মক্কার আকাবা নামক স্থান অর্থাৎ মিনায় যেখানে শয়তানকে পাথর মারা হয় সেখানে রাতের বেলায় এই বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়। এই বাইয়াতে তারা শপথ করেন যে তারা এক আল্লাহর ইবাদত করবেন। তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবেন না। তারা কেউ অন্যায় করবেন না। চুরি ও ব্যভিচারের মত মন্দ কাজগুলো ত্যাগ করবেন। যদি তারা এই অঙ্গীকার মেনে চলতে পারেন তাহলে তাদের জন্য থাকবে জান্নাত। আর যদি কোনো ভুল হয়ে যায় তাহলে সে বিষয়ে আল্লাহর হাতে। আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করবেন অথবা শাস্তি দিবেন।

 

সে রাতের এই শপথকে আকাবার প্রথম বাইয়াত বলা হয়। কারণ এরপর আরও একবার আরও বেশি সংখ্যক মদিনাবাসী সাহাবিদেরকে রাসুলুল্লাহ সা. বাইয়াত করান। আমরা পরে সে বিষয়ে আলোচনা করব।

 

ইসলামের প্রথম প্রতিনিধি

মক্কা থেকে মদিনায় ফিরে গিয়ে নতুন ইসলাম গ্রহণকারীগণ রাসুলুল্লাহ সা.-কে চিঠি লিখেন। তারা দেখলেন, ইসলাম তারা গ্রহণ করেছেন ঠিকই কিন্তু তাদেরকে কুরআন ও ইসলামের বিধি-বিধান শেখানোর মত মদিনায় কেউ নেই। তারা রাসুলুল্লাহ সা.-কে অনুরোধ করেন, যেন তাদের কাছে এমন কাউকে পাঠানো হয় যার কাছ থেকে তারা কুরআন ও ইসলাম শিখতে পারবেন। তিনি তাদের নামায পড়াবেন এবং ইবাদতের প্রয়োজনীয় মাসায়েল শেখাবেন।

 

তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ সা. বিশিষ্ট সাহাবি মুসআব ইবনে উমাইর রা.-কে মদিনায় পাঠান। তার মেহমানদারি করেন খাযরাজের গোত্রের নেতা আসআদ ইবনে যুরারা রা., যিনি মক্কায় প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী দলের একজন সদস্য ছিলেন।

 

মদিনায় গিয়ে মুসআব রা. রাসুলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে ইসলামের দাওয়াত ও শিক্ষা প্রচার করতে শুরু করেন। তাঁর কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন বিশিষ্ট সাহাবি সাদ ইবনে মুআয রা. এবং উসাইদ ইবনে হুযাইর রা.। এ দুজনের মাধ্যমে তাদের গোত্রের অনেকে ইসলাম গ্রহণ করে।

 

তবে উসাইদ রা.-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি বেশ চমৎকার। মদিনায় গিয়ে মুসআব রা. একদিন একটি বাগানে সাহাবিদেরকে নিয়ে বসে ছিলেন। উসাইদ ও সাদ ইবনে মুআয দুজনে ছিলেন নিজ গোত্রের নেতা। সাদ ইবনে মুয়ায উসাইদকে বলেছিলেন, আসআদ ইবনে যুরারা আমার খালাত ভাই। সে মুসআবকে এনেছে, যে মদিনায় এসে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছে। সম্পর্কের কারণে আমি তার মেহমানকে কিছু বলতে পারছি না। তুমি যাও এবং তাদেরকে এসব কাজ করতে বাধা দাও।

 

উসাইদ সেখানে গিয়ে প্রথমে মুসআব রা.-কে গালমন্দ করলেন। তারপর বললেন, তোমার কত বড় সাহস! তুমি আমাদের মধ্যে যারা নিরীহ মানুষ তাদেরকে বোকা বানাচ্ছ। তোমাদের কোনো কাজ থাকলে সেটা নিজেরা করো।

 

এসময় মুসআব রা. তাকে অনুরোধ করলেন যেন তিনি একটু বসে তার কথা শুনেন। উসাইদকে মুসআব রা. কুরআন শোনান, ইসলাম সম্পর্কে জানান। উসাইদ তখন বলেন, এ তো খুবই উত্তম বাণী। আমি যদি তোমাদের মত ইসলাম গ্রহণ করতে চাই তাহলে আমাকে কী করতে হবে?

 

মুসআব এবং আসআদ ইবনে যুরারা রা. জানান, প্রথমে গোসল করে পবিত্র হয়ে নাও। তারপর কালিমা শাহাদাত উচ্চারণ করো।

উসাইদ রা. গোসল করে কালিমা শাহাদাত পাঠ করে মুসলমান হয়ে যান

 

তারপর তিনি সাদ ইবনে মুয়াযের কাছে ফিরে গেলেন। তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে উৎসাহ দেন। সাদ ইবনে মুয়াযও তখন মুসলমান হয়ে যান। এরপর তাদের দেখাদেখি বনু আব্দিল আশহালের প্রায় সবাই ইসলাম গ্রহণ করে।

 

একসময় দেখা যায়, মদিনার বনু আব্দিল আশহাল গোত্রের বেশিরভাগ মানুষই ইসলাম গ্রহণ করেছেন। শুধু কয়েকজন ছিল যারা রাসুলুল্লাহ সা.-এর আগমনের পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এদের মধ্যে একজন ছিলেন আমর ইবনে সাবিত রা.। তিনি উহুদ যুদ্ধের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর উহুদ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং সেদিনই শহীদ হয়ে যান। তাঁর সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, তিনি এমন মানুষ যিনি এক রাকাত নামাযও আদায় করেননি তবু জান্নাতে চলে গিয়েছেন।

 

মদিনার বনু আব্দিল আশহাল গোত্র প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তারা ছিলেন খাঁটি ত্যাগী মুসলিম। কারণ রাসুলুল্লাহ সা. মদিনায় আসার আগেই তারা দূর থেকে ঈমান এনেছিলেন। এমনকি মদিনায় যারা পরবর্তীতে মুনাফিক হয়ে যায় তাদের মধ্যে এই গোত্রের কেউ ছিল না।

 

আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত

আকাবার প্রথম বাইয়াতের পরের বছর আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়। ততদিনে মুসআব ইবনে উমাইর রা. মদিনায় ইসলামের দাওয়াত দিয়ে আবার মক্কায় ফিরে এসেছেন। সেবার মদিনার হজের কাফেলার সাথে আরো অনেক সাহাবি মক্কায় আসেন। তাদের মধ্যে যারা ছিলেন তারা সবাই ছিলেন প্রথম সারির আনসারি সাহাবি। ইসলামে তাদের অবদান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ সাহাবি বদর, উহুদ ও খন্দক যুদ্ধে শহীদ হন। উল্লেখ্য, রাসুলুল্লাহ সা. মদিনায় হিজরতের মাত্র চার বছরের মধ্যে এই যুদ্ধগুলো সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে এসকল আনসারি সাহাবি অংশগ্রহণ করেন এবং সর্বোচ্চ বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদাতের মর্যাদা অর্জন করেন।

 

সংখ্যায় তারা ছিলেন বাহাত্তর জন্য পুরুষ ও দুজন নারী। কেউ কেউ অবশ্য চুয়াত্তর জন পুরুষের কথা উল্লেখ করেছন। তবে এদের মধ্যে নারী ছিলেন দুজন।

 

এই বাইয়াতে উপস্থিত হয়েছিলেন রাসুলুল্লাহ সা.-এর চাচা আব্বাস। তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তবে রাসুলুল্লাহ সা.-এর অভিভাবক হিসেবে তিনি সেখানে উপস্থিত হন।

 

আব্বাস মদিনা থেকে আসা হাজিদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমরা জানো, আমাদের মধ্যে মুহাম্মদের অবস্থান কী। আমাদের মধ্যে যারা তার বিরোধিতা করেছে তাদের হাত থেকে আমরা তাকে রক্ষা করেছি। সে নিজ গোত্রে মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে আছে। তবে সে তোমাদের কাছে যেতে চায় এবং তোমাদের সাথে যুক্ত হতে চায়। যদি তোমরা তাকে তোমাদের শহরে আহবান করে নেয়ার পর তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকো এবং তাকে তার বিরোধীদের হাত থেকে রক্ষা করো তাহলে তোমরা এই কাজ করতে পারো। আর যদি তোমরা মনে করো তোমরা এখান থেকে যাবার পর তাকে পরিত্যাগ করবে তাহলে এখনই তাকে ছেড়ে চলে যাও। কারণ সে নিজ দেশে সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে আছে।

 

তখন উপস্থিত সবাই বলে উঠলেন, আমরা সবই শুনলাম। হে আল্লাহর রাসুল, আপনি যা পছন্দ করেন তাই বেছে নিতে পারেন।

এরপর মদিনাবাসীর মধ্য থেকে আরেকজন কথা বলেন। তার নাম ছিল আব্বাস ইবনে নাদ্বলা রা.। তিনি আগের বছর বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমরা কি জানো কেন তোমরা বাইয়াত করছ? তোমরা যদি নিজেদের জান-মালের ক্ষতি হওয়ার পর তাকে ত্যাগ করো তাহলে তা হবে দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের জন্য অপমানের কারণ। আর যদি তোমরা নিজেদের জান-মালের ক্ষতির আশংকা সত্ত্বেও তাকে অনুসরণ করো তাহলে তা হবে দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে সর্বোত্তম।

 

তখন তারা রাসুলুল্লাহ সা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, যদি আমরা আমাদের জান-মালের ওপর প্রাধান্য দিয়ে মুহাম্মদ সা.-কে বেছে নেই তাহলে আমাদের জন্য কী থাকবে?

রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, জান্নাত।

তখন তারা বললেন, আপনার হাত দিন।

এভাবে তারা রাসুলুল্লাহ সা.-এর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহন করলেন এবং বাইয়াত গ্রহণ করলেন। এই ঘটনাকে আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত বলা হয়। নবুয়তের দ্বাদশ বছর এই বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

 

লেখক: নাজমুস সাকিব


প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৪

শেয়ার করুন :

Currently Reading

বাইয়াতুল আকাবা

Contact Us

,

Design & Developed by Neoscoder © 2026 - All right reserved by Ampublications

  • Privacy Policy
  • Terms & Conditions
  • Help & Support