সূরা কাফিরুন
বাংলা অর্থ
১. বলে দাও, হে কাফেররা!
২. তোমরা যাদের ইবাদত করো, আমি তাদের ইবাদত করি না।
৩. আর আমি যাদের ইবাদত করি, তোমরা তাঁর ইবাদত করো না।
৪. তোমরা যাদের ইবাদত করছো, আমি তাদেরও ইবাদত করবো না।
৫. আর আমি যাঁর ইবাদত করি তোমরাও তাঁর ইবাদত করবে না।
৬. তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আর আমার জন্য আমার দ্বীন।
সূরার নামকরণ: এই সূরার প্রথম আয়াত থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। কাফিরুন হচ্ছে কাফের শব্দের বহুবচন। কাফের অর্থ অস্বীকার করা। যারা ইসলাম অস্বীকার করেন তাদের কাফের বা অবিশ্বাসী বলা হয়।
নাযিলের সময়কাল: সূরা কাফিরুন মক্কায় নাযিল হয়েছে।
নাযিলের প্রেক্ষাপট: নাযিলের প্রেক্ষাপট বুঝলে সূরাটিতে যা বলা হচ্ছে সেটা বুঝতে সুবিধা হবে। এই সূরার প্রেক্ষাপট হচ্ছে, রসূল স. নবুয়ত পেয়ে মক্কার লোকদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত শুরু করেন। অধিকাংশ লোকেরা রসূল স. এর দাওয়াত অস্বীকার করে এবং মারমুখী আচরণ শুরু করে। রসূল স. ও তার সাথীদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার চালানো হয়।
অত্যাচার চালানো ছাড়াও তারা রসূল স.কে আপোস করার প্রস্তাব দেয়। আল্লাহর রসূল স.কে বেশ কিছু লোভনীয় প্রস্তাব দেয়। যেমন, তোমাকে আমরা মক্কার সেরা ধনী বানিয়ে দেবো, আমাদের বাদশা বানাবো, সুন্দরী নারীর সাথে বিয়ে দেবো ইত্যাদি। বিনিময়ে তুমি দ্বীন ইসলামের প্রচার বন্ধ করো এবং আমরা যার পূঁজা করি তাদের পূঁজা তোমাকে করতে হবে ইত্যাদি।
তারা বিভিন্ন সময়ে নানা রকম আপোসমূলক কথা বলতে থাকে। কখনো বলেছে, এক বছর তোমার প্রভুর ইবাদত করবো। অন্য বছর আমাদের প্রভুর ইবাদত তোমাকে করতে হবে। এসব প্রস্তাবে আল্লাহর রসূল কখনোই রাজি হননি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করেন। অত্যাচার বা লোভ কোনটাই তাকে দমাতে পারেনি। এমতাবস্থায় আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কার করে আয়াত নাজিল করেন। শুধু সূরা কাফিরুনে নয়, বিভিন্ন সময়ে আয়াত নাজিল করে এ ব্যাপারে দ্বীন ইসলামের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন।
আলোচ্য বিষয়: ইসলাম ছাড়া অন্য সকল ধর্মমত ও বিশ্বাসের সাথে মুমিনের সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছে।
সূরা কাফিরুন-এর ব্যাখ্যা:
প্রথম আয়াত: বলে দাও, হে কাফেররা!
শুরুতে কাফেরদের সম্বোধন করা হচ্ছে। এখানে একটা বিষয় বুঝার আছে। সেটা হচ্ছে, মুশরিক সম্বোধন করা হয়নি। কাফের ও মুশরিক দুটোই আরবি শব্দ। যারা আল্লাহ তায়ালার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে তারা মুশরিক। তবে বেশ কিছু ধর্ম বিশ্বাস রয়েছে যারা একত্ববাদে বিশ্বাস করলেও আল্লাহর রসূল ও ইসলামের শরীয়তকে মেনে নেয় না। ইসলামের পরিভাষায় তাদের কাফের বলা হয়। তাই মুমিন ছাড়া আর যারা আছে সবাই কাফের। এভাবে আল্লাহ তায়ালা মুমিন ছাড়া আর সবাইকে একযোগে সম্বোধন করলেন।
দ্বিতীয় আয়াত: তোমরা যাদের ইবাদত করো, আমি তাদের ইবাদত করি না।
এখানে ইবাদত শব্দটি বুঝা দরকার। আমরা ইবাদত বলতে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বুঝি। যেমন- নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদি। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার নিয়ম মেনে চলার নামই ইবাদত। সেটা খাওয়া থেকে শুরু করে সংসার ও কর্মজীবনের সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালাকে মেনে নেয়ার বিষয়টা হচ্ছে মুখে। আর ইবাদত হচ্ছে কর্মে।
সূরা কাফিরুনের কথাগুলো মুমিনের জন্য যুগান্তকারী ঘোষণা। কারণ একজন মুমিন দ্বীনের ব্যাপারে আপোস করতে পারে না। বরং একনিষ্ঠভাবে শুধু আল্লাহর দাসত্বের ঘোষণা দেয়। আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছু থেকে নিজের সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয়।
ইসলামের এই ঘোষণা বা বৈশিষ্ট্য মৌলিক বিশ্বাস। কালেমা তাওহীদে এই ঘোষণাটাই দিতে হয়। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ। অর্থাৎ কোনো ইলাহ নেই, আল্লাহ ছাড়া এবং মুহাম্মদ স. আল্লাহর রসূল।
তৃতীয় আয়াত: আমি যাদের ইবাদত করি, তোমরা তাঁর ইবাদত করো না।
মূলত আল্লাহ রসূল স.কে তারা যে আপোসের প্রস্তাব দিয়েছিল সেটা তারা নিজেরাই মানে না। তাদের আপোসের প্রস্তাবে ছিল, ‘মাঝে মাঝে তারাও আল্লাহর ইবাদত করবে’। অথচ আল্লাহ তায়ালার ইবাদত দূরের কথা তারা রসূল স. ও তার সাহাবীদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করেনি। তাদেরকে একঘরে করে রেখেছিল। নারী-শিশুসহ মুসলিম সম্প্রদায়কে দুর্গম শিয়াবে আবি তালিব এলাকায় আটকে রাখে। খাবারের অভাবে তারা অনেক কষ্ট করেছেন। অতিষ্ঠ হয়ে তারা মক্কা ছেড়ে মদীনা ও আশপাশের এলাকায় হিজরত করতে বাধ্য হন।
চতুর্থ আয়াত: তোমরা যাদের ইবাদত করছো, আমি তাদেরও ইবাদত করবো না।
এবার ঘোষণা দেয়া হচ্ছে, কাফেররা যাদের ইবাদত করে আল্লাহর রসূল কখনোই তাদের ইবাদত করবেন না। কোনো মুমিন কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। এটা চুড়ান্ত। এই ঘোষণাটি এতটা গুরুত্বপূর্ণ যে, আল্লাহর রসূল স. মাঝে মাঝে ফজরের নামাজে এটা তেলাওয়াত করতেন। প্রতি রাতে ঘুমানোর সময় এটা তেলাওয়াত করতেন। সাহাবীদেরও এমনটি করতে বলেছেন। কারণ এখানে শিরকের সাথে সম্পর্ক ছেদের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
পঞ্চম আয়াত: আর আমি যাঁর ইবাদত করি তোমরা তাঁর ইবাদতও করবে না।
আল্লাহ তায়ালা এটাও স্পষ্ট করে দিলেন যে, কাফেররা যতই সমঝোতা ও আপোসের কথা বলুক না কেনো তারা কখনই আল্লাহ তায়ালার একফোটা ইবাদতও করবে না। ওগুলো তাদের ধোকাবাজী কথাবার্তা। তাই কাফেররা মুসলমানদের মেনে নিবে এটা কিয়ামত পর্যন্ত সম্ভব না।
ষষ্ঠ আয়াত: তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আর আমার জন্য আমার দ্বীন।
এই শেষ ঘোষণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীন ও শরীয়তের সাথে ইসলাম কখনোই আপোস করে না। এখানে কোনো বিভ্রান্তি নেই। পরিস্থিতি বা লোভে পড়ে মুমিন বান্দা তার দ্বীনের মধ্যে অন্য কোনো দ্বীন ঢুকাবে না। সুতরাং এই সূরার প্রত্যেকটি ঘোষণা ইসলাম ছাড়া আর সবকিছু থেকে নিজের সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা। পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হওয়ার ঘোষণা। প্রত্যেক মুমিনকে এভাবেই ইসলাম চিনতে হবে।
সূরা কাফিরুনের শিক্ষা:
১. দ্বীন ইসলামকে আল্লাহ তায়ালা পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। ইসলাম বিধান হিসেবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা যাবে না।
২. ইসলাম যা কিছু অনুমোদন দেয় না সেটা অন্য বিশ্বাসের মধ্যে যতই ভালো দেখাক না কেনো গ্রহণ করা যাবে না।
৩. সূরা কাফিরুন বেশি বেশি পড়তে হবে। যাতে আমরা কিসের ঘোষণা দিয়েছি তা স্বরণে থাকে এবং তদানুযায়ী আমল করতে পারি।
লেখক : লতিফুর রহমান
শেয়ার করুন :
Currently Reading
.jpeg&w=3840&q=75)